মেয়র গউছের হ্যাট্রিক

হবিগঞ্জের ৫টি পৌরসভায় নিরব ভোট বিপ্লব হয়েছে। আর এ ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে জেলার ৩টিতেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। নিরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছেন হবিগঞ্জ পৌরসভার সাময়িক বরখাস্ত মেয়র কারান্তরীণ জিকে গউছ। নির্বাচনী ফলাফলে জিকে গউছ পেয়েছেন ১০ হাজার ৭শ ৯৭ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান মিজান নারিকেল গাছ মার্কায় পেয়েছেন ৯ হাজার ২শ ৬৩ ভোট। আওয়ামী লীগ প্রার্থী আতাউর রহমান সেলিম পান ৭ হাজার ৪শ ৩ ভোট। কারাগার থেকেও জিকে গউছ নির্বাচিত হওয়ায় বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অথচ তার কর্মী সমর্থকরা সঠিকভাবে প্রচারণাও করতে পারেননি। যদিও অনেককে প্রচারণা করতে দেখা গেছে। তারাও নিজেরা অনেকটা গাঁ বাঁচিয়েই প্রচারণা করেছেন। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার এড়াতে মাঠ থেকে চলে যেতে হয়েছে।

বুধবার নির্বাচনের দিনেও বিএনপিকে মাঠে তেমন দেখা যায়নি। অন্যান্য প্রার্থীর সমর্থকরা বুকে মার্কা ঝুলিয়ে যেভাবে ঘুরেছে, গউছের সমর্থকদেরও তেমনটা দেখা যায়নি। যে দুয়েকটি ভোট কেন্দ্রে হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেছে তাতেও বিএনপিকে নিরাপদ অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।

সব মিলিয়ে নির্বাচনে গউছের বিজয়কে নিরব ভোট বিপ্লব বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।

সাধারণ ভোটার ও সচেতন মহলের সাথে আলাপকালে তারা বলেন-জিকে গউছ জয়ী হওয়ার পেছনে নারী ভোটার ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছেন।

তাকে ভোট দিয়ে অনেকেই সহানুভূতি দেখিয়েছেন। শুধুমাত্র ধানের শীষ প্রতীক দেখে নয়, গউছের ব্যক্তি ইমেজ ও তার পুত্র মঞ্জুরুল কিবরিয়া প্রীতম মাঠে প্রচারণা চালিয়ে অনেকাংশে তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। যার ফলে জিকে গউছ তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে হ্যাট্রিক শিরোপা অর্জন করলেন।

অপর দিকে মেয়র পদে নবীগঞ্জ পৌরসভায় পর পর তিনবার নির্বাচিত অওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক তোফাজ্জুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করে প্রথম বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হলেন কাউন্সিলর পদে হ্যাট্রিক অর্জনকারী বিএনপির প্রার্থী আলহাজ্ব ছাবির আহমেদ চৌধুরী। নির্বাচনের আগে নবীগঞ্জে বিএনপি প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা ছিল একেবারেই ক্ষীণ। সে অবস্থান থেকে শুধু মাত্র নিজের জনপ্রিয়তা ও দলের নেতাকর্মীদের নির্ঘুম প্রচাণনার মধ্য দিয়ে মানুষের মন জয় করে নির্বাচিত হন ছাবির আহমেদ।

বুধবার সকাল থেকেই ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় নবীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন। এখানে বিএনপির প্রার্থী পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব ছাবির আহমেদ চৌধুরী ৫ হাজার ৬শ ২১ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান মেয়র অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম চৌধুরী পান ৩ হাজার ৭শ ৭৩ ভোট। ওই পৌরসভায় প্রথমে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে উপস্থিতি বাড়তে থাকে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘœ করতে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল তৎপর।

তবে শায়েস্তাগঞ্জ পৌর নির্বাচনে সাবেক মেয়র হাজী জাহির আহমেদ ময়না মিয়ার ছেলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোঃ ছালেক মিয়া পর পর দুইবার নির্বাচিত মেয়র বিএনপির প্রার্থী ফরিদ আহমেদ অলিকে পরাজিত করে হবিগঞ্জবাসীকে চমক দেখিয়েছেন। অবশ্য ছালেক মিয়া নির্বাচিত হওয়ার পেছনে সবছেয়ে বড় অবদান রেখেছে ওই এলাকায় বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এডঃ মোঃ আবু জাহির এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভাসহ এর আশাপাশের এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। যার ফলশ্রুতিতে জনপ্রিয় না হয়েও মেয়র নির্বাচিত হন মোঃ ছালেক মিয়া।

এদিকে পরাজিত বিএনপির প্রার্থী ফরিদ আহমেদ অলি পর পর দুই বার মেয়র ছিলেন। এর আগে ফরিদ এর পিতা শায়েস্তাগঞ্জ পৌর বিএনপির নেতা হাজী জাহির আহমেদ ময়না মিয়াও ছিলেন ওই পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র। পিতার মৃত্যুর পর নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফরিদ আহমেদ অলি মেয়র নির্বাচিত হন।

ওই পৌরসভায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ হয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে ভোটারদের উপস্থিতিও বৃদ্ধি পায়। একযোগে ৯টি কেন্দ্রে টানা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চলে ভোট গ্রহণ। তবে সকল ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটাদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।

এ সকল এলাকায় বৃদ্ধ বয়সের অনেক লোককেই নানা কেন্দ্রে ভোট দিতে দেখা গেছে। প্রতিবন্ধি ও বৃদ্ধ লোকদের ভোট কেন্দ্রে আসতে সার্বিকভাবে সহায়তা করেছেন প্রশাসনের লোকেরা। জাল ভোট হয়নি বললেই চলে। উৎসবমূখর শান্তিপূর্ণ এ নির্বাচনে ভোটারদের মনে আনন্দ দিয়েছে। ভোটাররাও মনের আনন্দে এসে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

অন্য দিকে জেলার চুনারুঘাট ও মাধবপুর পৌরসভায় সাবেক মেয়ররাই নির্বাচিত হয়েছেন। চুনারুঘাট পৌরসভা নির্বাচনে মাত্র ১৪ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ের মালা পড়েছেন বিএনপি’র নাজিম উদ্দিন আহমেদ সামসু। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ৭শ ৩৫টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাইফুল আলম রুবেল নৌকা প্রতীকে ভোট পান ৪ হাজার ৭শ ২১ ভোট। ভোট গ্রহণ চলাকালে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়কে টহল দেয়। মাধবপুর পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিরেন্দ্র লাল সাহা নৌকা প্রতীক মাত্র ৭শ ৮৫ ভোট বেশি পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ৫ হাজার ৭ শ ৩৩ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রহমান মানিক পান ৪ হাজার ৯শ ৪৮ ভোট।

Leave a Reply

Inline
Inline