মুখগহ্বরের ক্যানসারের খুঁটিনাটি

ডেস্ক রিপোর্ট : খুব সহজে বললে ক্যানসার হলো কোনো কোষের অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা বৃদ্ধি। একটি কোষ থেকে এই রোগের বা বৃদ্ধির সূত্রপাত হয়। কিন্তু সেখানেই তা সীমাবদ্ধ থাকে না। ওই কোষটির পাশাপাশি অন্য কোষগুলোতে তা ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের যেকোনো অংশেই এই ব্যাপারটি ঘটতে পারে। ফলে শরীরের যেকোনো অংশেই ক্যানসার রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মুখগহ্বরের মধ্যে যখন এই রোগ ছড়ায় তখন তাকে মুখগহ্বরের ক্যানসার বা ওরাল ক্যানসার বলা হয়। মুখগহ্বরের মধ্যে ঠোঁট, জিহ্বা, তালু, দাঁতের মাড়ি, গলা, চোয়াল, লালাগ্রন্থি-সহ যেকোনো জায়গাতেই কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি থেকে ক্যানসার হতে পারে।

কতটা উদ্বেগের

যেকোনো রোগই উদ্বেগের। এখন রোগটি যদি ক্যানসার হয় তা হলে তো কথাই নেই। এ অঞ্চলে ওরাল ক্যানসার বা মুখগহ্বরের ক্যানসারের হার অন্য নানা ধরনের ক্যানসারের থেকে বেশি। ফলে মুখগহ্বরের ক্যানসার হলে তা সত্যিই উদ্বেগের। তবে যদি কিছু নিয়ম মেনে চলা যায় তাহলে মুখগহ্বরের ক্যানসারের আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

মুখগহ্বরের ক্যানসারের কারণ

মুখগহ্বরের ক্যানসারের পেছনে মূলত দায়ী তামাকজাত পদার্থ ব্যবহার। বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, খৈনি— ব্যবহারের জন্যই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই রোগটি হয়। এ ছাড়া মদ, গুটকা, সুপারি, পানমশলা অত্যধিক সেবনেও এই রোগ হতে পারে। যারা মদ্যপান এবং ধূমপান— দুটিই এক সঙ্গে করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগের আশঙ্কা বেশ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এছাড়া আরও কয়েকটি কারণে মুখগহ্বরে ক্যানসার হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ, নিয়মিত মুখগহ্বর পরিষ্কার না করা। আবার অনেক সময়ে দাঁতের ক্ষয় হয়ে দাঁতের প্রান্ত ধারালো হয়ে যায়। সেই ধারালো দাঁতের বার বার ঘর্ষণেও মুখের ভেতর ক্যানসার হতে পারে।

এছাড়া মুখের ভেতর দীর্ঘক্ষণ ধরে কোনো কিছু রেখে চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস থাকলে, তার মধ্যে তামাকজাত কিছু না থাকলেও এই ধরনের ক্যানসার হতে পারে। এইচআইভি-র মতো কিছু ভাইরাসের সংক্রমণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস নামে এক ধরনের ভাইরাসের আক্রমণে, সূর্যালোকে দীর্ঘক্ষণ থাকলে সূর্যের আলোর মধ্যে থাকা অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মুখগহ্বরের ক্যানসার হতে পারে। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর খাবার বা অনেক দিনের বাসি খাবার খেলেও মুখের ভেতরে ক্যানসারের আশঙ্কা থেকে যায়।

এছাড়া বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ওরাল সেক্সের কারণে মুখগহ্বরের ক্যানসারের মাত্রা অনেক বেশি। যোনি বা পুরুষাঙ্গের মুখ দেয়া মোটেই ঠিক নয়। তবুও একশ্রেণির মানুষ এ পদ্ধতিতে যৌনমিলন করে থাকে।

রোগের লক্ষণ

এই রোগের সবচেয়ে বড় লক্ষণ মুখের ভেতরে অনেক দিন ধরে রয়ে যাওয়া ক্ষত বা ঘা। আপনা থেকে এই ক্ষত বা ঘা সেরে যায় না। তবে সেই ক্ষতে বা ঘায়ে যে ব্যথা থাকবে এমন নাও হতে পারে। ব্যথা বা যন্ত্রণা ছাড়াও ক্ষতটি রয়ে যেতে পারে দীর্ঘ দিন। এছাড়া মুখগহ্বরে লাল বা সাদা আস্তরণ পড়লে, মাংসপিণ্ড তৈরি হলে সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি লালাগ্রন্থি ফুলে যেতে পারে। এর ফলে কথা বলতে বা ঢোক গিলতে কষ্ট হয়, শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়, গলার স্বরের পরিবর্তন হয়। এগুলিকেই মুখগহ্বরের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। তবে এটা মনে রাখা দরকার এই সব লক্ষণগুলো কিন্তু অন্য কারণেও হতে পারে। তবে এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মুখের ক্যানসারের চিকিৎসায় সফলতার হার

আগে এ রকম একটা ধারণা ছিল যে, ক্যানসার হলে আর রোগী বাঁচবে না। কিন্তু এখন এই কথাটা আর ঠিক নয়। ক্যানসারের অনেক উন্নত চিকিৎসা বেরিয়েছে, বিশেষ করে মুখের ক্যানসারের ক্ষেত্রে। সেই সব চিকিৎসা করলে ক্যানসারের একেবারে নিরাময় সম্ভব।

ক্যানসারের চিকিৎসা

মুখগহ্বরের ক্যানসারের চিকিৎসা কীভাবে হবে তা নির্ভর করে মূলত ক্যানসার কোন পর্যায়ে রয়েছে তা জেনে। প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে ধরা পড়লে শুধুমাত্র অস্ত্রোপচার করলেই ক্যানসার সেরে যাওয়া সম্ভব। তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ে অস্ত্রোপচার করার পরে রেডিওথেরাপি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেমোথেরাপিও করা হয়। রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি একসঙ্গে চললে তাকে বলা হয় ‘কেমো-রেডিয়েশন’। মুখের ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই বেশি কার্যকরী। এ ছাড়া, ক্যানসারের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর মানসিক চিকিৎসার ব্যাপারেও জোর দিতে হয়। কেননা, ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক রোগীই মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যান। অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ফলে দেখা গিয়েছে, অনেক রোগীর প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসার হওয়া সত্ত্বেও তারা মারা গিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে রোগীকে মনোবল বাড়ানোর জন্য তার পাশে থাকতে হবে।

মুখের ক্যানসার ঠেকাতে করণীয়

তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারে মুখগহ্বরে ক্যানসারের আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে যায়। তাই তা বর্জন করা উচিত। একই সঙ্গে মদ্যপান না করা, খৈনি, সুপারি, পানমশলা জাতীয় খাবার দীর্ঘসময় ধরে মুখের মধ্যে না রাখার কথা মনে রাখতে হবে। মুখগহ্বর পরিষ্কার করা বা দাঁতের যত্ন নেওয়া সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। ঠোঁট বা গাল কামড়ানোর অভ্যাস ত্যাগ করা। সুষম খাবার খাওয়া। মুখের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে ঘা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে ক্যানসার রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষয়গুলি এড়িয়ে চললে বা জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলে ক্যানসার থেকে দূরে থাকা সম্ভব। আনন্দবাজার

Inline
Inline