মিয়ানমারে মুসলিম গণহত্যা বন্ধ হোক : মুহম্মদ আলতাফ হোসেন

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফের রোহিঙ্গা মুসলমান নিধন শুরু হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ এবং মগ দস্যুরা একট্টা হয়ে এই নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে ২৪টি নিরাপত্তা চেকপোস্টে হামলার যে ঘটনা ঘটে তারই অজুহাতে নিরিহ-নিরপরাধ রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলছে অকথ্য নির্যাতন, গুম, ধর্ষণ ও গ্রেফতার। প্রাণভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ও পলায়নপর রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা করতে কিংবা তাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালাতেও ঘাতক-জালেমরা দ্বিধা করছেনা। এযাবৎ শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে উদ্বাস্ততে পরিণত করা হয়েছে। তাদেরই একাংশ, যাদের সংখ্যা ৫০ হাজারের অধিক, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে জড়ো হয়েছে। পাহাড়-জঙ্গল-নদী ও বাড়িঘরে আটকে আছে আরও লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান। গত ১১ আগস্ট হঠাতই রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রবেশ করে। তখনই আশংকা করা হয়, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর আরেকটি জুলুম-নির্যাতনের তান্ডব আসন্ন। সেনা ও পুলিশ সদস্যরা গ্রামগুলো অবরুদ্ধ ক’রে টহল শুরু করে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান খাদ্য-পানিসহ নানারকম সংকটে পতিত হয়। তারপরই ওই নিরাপত্তা চেকপোস্টে হামলার ঘটনা ঘটে। আর তাকে উসিলা করেই শুরু হয়েছে গণহত্যা, গণনির্যাতন ও গণবিতাড়ন। ঘটনা প্রবাহ থেকে সহজেই প্রতীয়মাণ হয়, এই গণহত্যা, গণনির্যাতন ও গণবিতাড়ন পূর্ব পরিকল্পিত। কথিত হামলার ঘটনা তাকে দ্রুতায়িত করেছে মাত্র। স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছর ৯ অক্টোবর এরকমই একটি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ ও মগ দস্যুরা ব্যাপক গণহত্যা চালায়। শত শত রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত হয়। নিপীড়ন-নির্যাতন লুণ্ঠন, ধর্ষণ সীমা ছাড়িয়ে যায়। হাজার হাজার অসহায়-নিরাশ্রয় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এবারও সেইসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে দেশটির উত্তর-পূর্ব রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের গ্রামে আগুন দিয়ে বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেয়াসহ গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সহিংসতার শিকার হয়ে গত বছরের অক্টোবরে থেকে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এবার আরো প্রায় ৯০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম এরই মধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া গত কয়েক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবির কড়া প্রহরা সত্ত্বেও প্রতিদিনই সীমোন্তের নানা ফাঁক গলে প্রবেশ করছেন রোহিঙ্গারা। তবে প্রচুর রোহিঙ্গাকে পুশব্যাকও করা হচ্ছে। এর আগে ২০১২ সালের জুনেও মিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। ওই সময় সরকার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে শক্ত অবস্থান নেয়। যার ফলে ওই সময়ে সাড়ে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা পুশব্যাক করা হয়।
গত বছরের গণহত্যা, গণনির্যাতন ও গণবিতাড়নের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। জাতিসংঘ ছাড়াও বিভিন্ন দেশ এর প্রতিবাদ জানায়। মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হত্যা-নির্যাতন বন্ধ করতে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার প্রশ্নে বিশ্বজনমত একই সমতলে এসে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন ঘটিত হয়। কদিন আগে কমিশন তার রিপোর্ট ও সুপারিশ পেশ করেছে। ওই রিপোটে রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে ৮৮টি সুপারিশ করা হয়েছে যার মধ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার ও তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কমিশনের এই রিপোর্ট ও সুপারিশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে যখন ইতিবাচক একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা জাগ্রত করে, ঠিক সেই সময়ে নতুন করে রোহিঙ্গাহত্যা-নির্যাতনের আর, একটা অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এর শেষ কিভাবে, কোথায় গিয়ে হবে তা এখনই বলার উপায় নেই। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনের কথা কখনই স্বীকার করে না। গত বছরের ঘটনা তদন্তে সরকারীভাবে গঠিত কমিটির রিপোর্টে নিলর্জ্জভাবে দাবি করা হয়েছে, কোনো হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি। বড়ই পরিতাপের বিষয়, গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী বলে পরিচিত অং সান সূ চি নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের হত্যা-নির্যাতন ও বর্বরতার প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, ‘আমি নিরাপত্তাবাহিনীর ও পুলিশ সদস্যদের প্রশংসা করতে চাই যারা অসীম সাহসের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন।’ আশঙ্কা করা হচ্ছে, অংসান সূচির এই মনোভাবের প্রেক্ষাপটে চলমান পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে।
রাখাইনে রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশী বেকায়দায় পড়ে যায়। অসহায়-নিরাশ্রয় রোহিঙ্গা মুসলমানেরা বাংলাদেশের দিকেই ছুটে আসে। এভাবে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। গত বছর এসেছে প্রায় এক লাখ। মানবিক কারণেই বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়। এবারও ইতোমধ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান প্রবেশ করেছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ‘বাঙালী’ বলে প্রচার করে, যদিও তারা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করছে। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর লোকের মতো তারাও সেখানকার ভূমিপুত্র। বাঙালী বলে অভিহিত করে মিয়ানমার তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চায়। বাংলাদেশ এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এবারও প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই সঙ্গে মিয়ানমারের ঘটমান পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গা-অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকার নিলেও তাদের আসা পুরোপুরি রোধ করা যাচ্ছে না। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ এই গণহত্যা, গণনির্যাতন ও গণবিতাড়নে উদ্বেগ ব্যক্ত করেছে। সংযম প্রদর্শনের আহবান জানিয়েছে। বলা বাহুল্য, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যা, নৃশৃংসতা ও বর্বরতার অবসান হবে না। এজন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। গোটা একটি জাতিগোষ্ঠী নির্মূল করে দেয়া হবে, এটা হতে পারে না। একথা সকলেরই জানা, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। এ ব্যাপারে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে। চীন এক্ষেত্রে সবচেয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা আশা করতে চাই, হত্যা-নির্যাতন-বিতাড়নের মতো মানবাধিকার লংঘনের অপরাধ প্রতিরোধে চীন কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এ মুহূর্ত গণহত্যা বন্ধ করা জরুরি। বাংলাদেশ-চীনসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সম্প্রদায়ক
একযোগে সোচ্চারে বলতে হবে, গণহত্যা, বন্ধ করা হোক। বন্ধ করা হোক গণনির্যাতন ও গণবিতাড়ন।
ঐতিহাসিকভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের নাগরিক হলেও দেশটির সরকার তা স্বীকার করতে চায় না। বিভিন্ন সময়ে সে হামলা ও হত্যা মিশনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। যারা থেকে গেছে তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে। এমনকি তাদের মুক্তভাবে চলাফেরা করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে অনেকটা নিজ দেশে পরবাসী করে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্র কর্তৃক এ ধরনের নাগরিক উচ্ছেদ নীতি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বলা বাহুল্য, কখনো কখনো নিপীড়িতদের মধ্য থেকেই প্রতিরোধ গড়ে উঠে। যার সাম্প্রতিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বছর অক্টোবরে রাখাইনের সীমান্ত চৌকিতে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপের হামলার মাধ্যমে। যদিও এ হামলা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। হামলার জবাব দিতে গিয়ে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী পুরো রাখাইনে মুসলমানদের উপর বর্বরতম হামলা চালায়। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, নারী ও শিশুসহ শত শত মানুষ হত্যা করে এবং ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের তান্ডব চালায়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলা হয়। হাজার হাজার নিরীহ রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমায়। বাংলাদেশেই প্রবেশ করে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর এ নৃশংসতা জাতিসংঘ, ওআইসিসহ বিভিন্ন দেশ নিন্দা জানায়। শান্তিতে নোবেল জয়ী দেশটির নেত্রী অং সান সূচি বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের কাছে চরমভাবে ধিকৃত হন। কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের কার্যক্রম নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও কমিশন যখন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তখন রাখাইন সশস্ত্র গ্রুপের হামলার বিষয়টি পুরো পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ ঘটনা অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। এতে রোহিঙ্গাদের উপর নিধনযজ্ঞ চালানোর একটি উসিলা মিয়ানমার সরকারের হাতে তুলে দেয়া হলো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মুসলমান বিরোধী কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করা হলো।
হিংসা প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। দমন বিদ্রোহের সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের অস্বীকার এবং তাদের বিতাড়নে মিয়ানমার সরকারের যে প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ, তা রোহিঙ্গাদের একটি গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ ও দ্রোহের জন্ম দিয়েছে। তবে তাদের মধ্য থেকে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছে কিনা, এ বিষয়টি নিয়েও ভাবার অবকাশ রয়েছে।  বিশ্বের পরাশক্তিধর কিছু দেশ মুসলমানদের মধ্য থেকেই এক শ্রেণীর বিপদগামী নিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি করে তাদের দিয়ে অপকর্ম করিয়ে তার দায় মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। রাখাইনে হামলাকারী সশস্ত্র গ্রুপের পেছনে মুসলমান বিদ্বেষী কোনো অপশক্তি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বলার অবকাশ রয়েছে, তারা রোহিঙ্গাদের পক্ষ হয়ে যে হামলা করেছে, তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের হামলা অযৌক্তিক ও অন্যায়। রাষ্ট্র শক্তির সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে কোনো গোষ্ঠীই টিকে থাকতে পারে না। এটা অসম যুদ্ধ। এ যুদ্ধ থেকে তাদের সরে আসা উচিত। তাদের এটা পুরোপুরি ভুল পদক্ষেপ। এতে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূলের যে সিদ্ধান্ত, তার যৌক্তিকতাই প্রমান করবে। মিয়ানমারে নতুন করে যে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
দুনিয়ার সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে তাণ্ডবে মিয়ানমারের  সরকারি বাহিনীর সঙ্গে একযোগে হামলায় অংশ নিচ্ছে স্থানীয় উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা। ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ আর রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞ থেকে জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গাদের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশ সীমান্তে। কিন্তু সেখানেও কড়া পাহারা বিজিবি’র। সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে হাজারো রোহিঙ্গার আর্তনাদ। এদের কেউবা এসেছেন মুমূর্ষ শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে কেউবা আবার গুলিবিদ্ধ অবস্থায়। কেউ এসেছে বয়োবৃদ্ধ মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে।
ইতিহাসের কালপঞ্জিতে দেখে নেওয়া যাক রোহিঙ্গাদের কিভাবে নিঃশেষ করে দিচ্ছে মিয়ানমার। ১৭৮৪ সালে বার্মার তৎকালীন রাজা আরাকান দখলের পর থেকে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ ভাগ্যবিড়ম্বনার শুরু। ১৭৯৯ সালে পঁয়ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষ বার্মিজদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে আরাকান থেকে নিকটবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসে। ওই সময় আরাকানের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।
ব্রিটিশরা এ অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার পর ১৯৬২ সালে বার্মার সামরিক জান্তা দেশটির ক্ষমতা দখল করে। মূলত এরপর থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ১৯৭০ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ দেওয়া বন্ধ করে দেয় বার্মিজ কর্তৃপক্ষ।
১৯৭৪ সালে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে অপারেশন নাগামিন বা ড্রাগন কিং নামে একটি অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সরকার। তখন দাবি করা হয়েছিল এর উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনও বিদেশি মিয়ানমারে অবস্থান করছেন কিনা; তা যাচাই করা। তবে প্রকৃতপক্ষে এটি রোহিঙ্গা বিরোধী অভিযানে পরিণত হয়। সে সময় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি প্রত্যাবসন চুক্তি হয়। এর অধীনে প্রায় সব রোহিঙ্গা ফেরত চলে যান।
১৯৮২ সালে মিয়ানমার নাগরিক আইন জারি করে। ওই আইনে দেশটিতে বসবাসরত ১৩৫টি জাতিকে স্বীকার করে নিলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। এই আইন এখনও বলবৎ আছে। রোহিঙ্গারা সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন না। জমির মালিকানা অর্জন করতে পারেন না। দুইটির বেশি সন্তান না নেওয়ার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়।
১৯৯১ সালে ‘রাখাইনে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে’ সরকারিভাবে দ্বিতীয় দফায় শুরু হয় রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান। সে সময় প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা আবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। ১৯৯২ সালের শেষদিকে এবং ১৯৯৩ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যান। রোহিঙ্গাদের শেষ ব্যাচটি ২০০৫ সালে ফেরত যায়। সে সময় থেকে বাংলাদেশে থেকে ফিরে যায় প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। ২০১২ সালের রোহিঙ্গাবিরোধী দাঙ্গায় নিহত হন শতাধিক রোহিঙ্গা। গৃহহীন মানুষের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। সে সময় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।
২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর বার্মিজ পুলিশ অভিযোগ করে, শতাধিক সন্ত্রাসী (রোহিঙ্গা) তাদের সীমান্তবর্তী তিনটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ৯ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে। এ সময় পাল্টা হামলায় আট হামলাকারীও নিহত হয়। পুলিশের দাবি, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন নামের একটি সামরিক গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে। পরদিন ১০ অক্টোবর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বিভিন্ন শহরে সেনা মোতায়েন করা হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর স্থানীয় অমুসলিম বাসিন্দাদের নিয়ে গঠিত বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা জানায় বার্মিজ পুলিশ।
৯ অক্টোবর মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গাদের দায়ী করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় নতুন করে জাতিগত নিধনযজ্ঞ। সে সময় জীবন বাঁচাতে দলে দলে বাংলাদেশে ছুটে আসে রোহিঙ্গারা। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে বর্তমানে চার লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারির গোড়ার দিকে বার্মিজ পুলিশ কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, সারি বেঁধে বসে থাকা রোহিঙ্গাদের ঘিরে আছে পুলিশ সদস্যরা। এক পর্যায়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এক রোহিঙ্গাকে মারধর করতে শুরু করে। আরেক কর্মকর্তা এসে লাথি মারে তার মুখে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও মারধর করতে থাকে পুলিশ সদস্যরা। এক পুলিশ কর্মকর্তার ধারণ করা এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দুনিয়াজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে মিয়ানমার সরকার। চাপের মুখে আইন ভঙ্গকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশন জানায়, রাখাইন প্রদেশের মংডুতে কোনও ধরনের গণহত্যা বা ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
জানুয়ারির শেষ দিকে সফররত কফি আনান কমিশনের সদস্যরা জানান, রাখাইন প্রদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা ৮০ শতাংশ নারী মিয়ানমারে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর এক প্রতিবেদনেও একই রকমের তথ্য উঠে আসে। এতে বলা হয়, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রোহিঙ্গা নারীরা এমন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২১ জানুয়ারি মিয়ানমারের মংডু’তে কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় তিন রোহিঙ্গা মুসলিমের মরদেহের সন্ধান মিলে। এ ঘটনায় নাগরিক অধিকারের জন্য লড়াই করা রোহিঙ্গা দলগুলোকে দায়ী করে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
মার্চে বার্মিজ পুলিশের হাতে আটক ৪২৩ জন রোহিঙ্গার একটি তালিকা প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর থেকে আটক হওয়া এসব ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩টি শিশুও ছিল। ছিলেন ৭৫ বছরের বৃদ্ধও। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি স্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। বার্মিজ পুলিশের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, রোহিঙ্গা হামলাকারীদের সঙ্গে যারা সহযোগিতা করছে তাদেরই পুলিশ গ্রেফতার করছে। সে শিশুই হোক আর যা-ই হোক। তারা অপরাধী কিনা; সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার আমাদের নয়। এটা আদালতের বিষয়।
এপ্রিলে বিবিসি’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর কথা অস্বীকার করেন দেশটির ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী নোবেলজয়ী অং সান সু চি। তিনি বলেন, ‘রাখাইনে কিছু সহিংসতা চলছে। সেখানে মুসলমানরাও মুসলমানদের হত্যা করছে। তবে আমি মনে করি না, সেখানে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলছে। প্রকৃত অবস্থা বোঝাতে এটি অত্যন্ত কঠিন একটি শব্দ।’
মে মাসে বার্মিজ সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যে হত্যা, ধর্ষণ বা নির্যাতনের যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল তা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। ২৭ জুন রাখাইন রাজ্যের পুলিশ প্রধান সেইন লুইন ঘোষণা করেন, মুখোশধারী হামলাকারীদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বাহিনী ‘উচ্চ সতর্ক’ অবস্থান নিয়েছে। ৪ জুলাই রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিটওয়ের রাস্তায় সাত রোহিঙ্গাকে দেখতে পেয়ে তাদের ওপর হামলে পড়ে একদল উগ্রপন্থী বৌদ্ধ। তাদের দিকে ইট-পাথর ছুঁড়ে মারে হামলাকারীরা। এতে একজন নিহত হন। আহত হন ছয়জন। সিটওয়ে শহরের বাইরে একটি ক্যাম্পে থাকতেন ওই সাত রোহিঙ্গা। শহরের একটি আদালতে এক মামলায় সাক্ষ্য দিতে তারা ক্যাম্প ছাড়ার অনুমতি পেয়েছিলেন। সাক্ষ্য দেওয়া শেষে তারা স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নৌকা কিনতে সেখানে যেতে পুলিশের সাহায্য চান। ওই নৌকা কেনার সময়ই তাদের ওপর হামলে পড়ে উগ্রপন্থীরা। ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শেষ করার ঘোষণা দেয় রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে গঠিত মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয, সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের খুন, ধর্ষণ এবং তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের কোনও প্রমাণ মেলেনি। তাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ ভিত্তিহীন। ২৪ আগস্ট মিয়ানমার সরকার এক বিবৃতিতে দাবি করে, রাখাইন রাজ্যের বিদ্রোহীরা ২৪টি পুলিশ চেকপোস্টে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। রাতভর সংঘর্ষে ৮০ বিদ্রোহীসহ (রোহিঙ্গা) ৯৮ জন নিহত হয়েছে। এই ঘটনায় রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে তাণ্ডব শুরু করে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। নির্বিচার খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ থেকে বাঁচতে এরই মধ্যে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন সহস্রাধিক রোহিঙ্গা।

altaf husain

লেখক পরিচিতি :
মুহম্মদ আলতাফ হোসেন (সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক)
সভাপতি
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা