মানুষ চেনার উপায়

ব্যক্তিত্ব ও আচরণের দিক থেকে প্রতিটি মানুষ আলাদা। প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ভাবনা ও স্বতন্ত্র স্টাইল। যা অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে। প্রাচীন সামুদ্রিক শাস্ত্রে এ বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য রয়েছে যা দেখে একজন মানুষের প্রকৃতি ও তার ব্যক্তিত্ববোধ সম্পর্কে জানা যায়। চলুন জেনে নেওয়া যাক তেমন কিছু তথ্য।
মুখের গঠন, হাঁটার ধরণ কিংবা শব্দচয়ন প্রতিটি মানুষের আলাদা। কারো মুখের গঠন লম্বা, কারো গোল, আবার কারো চৌকো। কেউ ধীরে হাঁটেন, কেউ দ্রুতলয়ে। কেউ সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটেন, কেউ মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটেন। কথা বলার ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রত্যেকের নিজস্ব স্টাইল। কেউ ধীরস্থিরভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। আবার কেউ স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করেই কথা বলতে শুরু করেন।
আপনি যদি সচেতন হন তবে প্রথম সাক্ষাতেই অন্যের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাভাবনার স্তর সম্পর্কে বুঝতে পারবেন। এছাড়া হাতের লেখা কিংবা গ্রাফোলজির মাধ্যমেও আপনি মনোবিক্ষণ করতে পারেন। এ প্রক্রিয়ায় পেশাক্ষেত্রে উপযুক্ত লোক নির্বাচন কিংবা ব্যবসায়িক পার্টনার নির্বাচন সহজ হতে পারে।
চলার ধরণ: প্রতিটি মানুষের মুখের গড়ন যেমন আলাদা, তেমনি চলার ধরনও আলাদা। ধরুন, পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধুদের নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন কেউ একজন সাথে নেই। অন্যদের চেয়ে এগিয়ে গেছেন বেশ দূরত্বে। যারা সাধারণত দ্রুত গতিতে হাঁটেন তারা সাধারণত আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হন। এরা যে কোনো কিছু দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করেন। শারীরিক গঠন যাই হোক না কেন, এরা যথেষ্ট প্রাণবন্ত ও মনোদৈহিকভাবে শক্তিশালী। এরা দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ও সহজেই রেগে যায়।
আর যারা ধীর গতিতে হাঁটেন তারা কিছুটা শান্ত ও ভাবুক প্রকৃতির। এরা সাধারণত কোনো ধরনের ঝামেলায় জড়াতে পছন্দ করেন না। এছাড়া হুট করে কোনো বিষয়ে এরা সিদ্ধান্ত নেন না। যে কোনো কাজ ধীরস্থিরভাবে করতে পছন্দ করেন।
প্রায়ই দেখা যায় কিছু লোক আছেন যারা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে যান। মুহূর্ত পর আবার হাঁটতে শুরু করেন। পথিমধ্যে পকেট কিংবা ব্যাগ হাতড়ে নিশ্চিত হয়ে নেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা অন্যান্য জিনিস ঠিক আছে কিনা। এরা কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও ভুলোমনা। এ ধরনের মানুষ মাঝেমধ্যে শিশুসুলভ আচরণ করেন। প্রায়ই ভুল করে দরকারি কাজ ফেলে অন্যকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ছেলে বুড়ো যে কারো মধ্যে এমন আচরণ লক্ষ্য করা যেতে পারে।
হাতের লেখা বা গ্রাফোলজি: যারা হাতের লেখা নিয়ে গবেষণা করেন তাদের গ্রাফোলজিস্ট বলে। হাতের লেখা দেখেই তারা ব্যক্তিত্ব অভিক্ষণ চালিয়ে যান। এক্ষেত্রে সচেতনতারও দরকার রয়েছে। হাতের লেখার মাধ্যমে কমপক্ষে ৫ হাজার ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। মনোবিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞানেও এর যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে। হাতের লেখায় বিশেষ কিছু বর্ণের ব্যবহারের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হয়। যেমন ইংরেজি অক্ষর ‘আই’।
এ অক্ষরটির মাধ্যমে একজন মানুষের শৈল্পিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ পায়। অনেকে ‘আই’ লেখার ক্ষেত্রে উপরে ফোটার পরিবর্তে ছোট বা বড় করে শূণ্য দেন। অনেকের ক্ষেত্রে তা হয় প্রদীপের শিখা কিংবা ভালোবাসার চিহ্নের মতো। এদের ক্ষেত্রে দেখা যায় এরা যে কোনো কাজ আনন্দ নিয়ে করেন। নতুন নতুন চিন্তা ও ধারণা দিয়ে চমকে দেন পরিচিতদের। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পছন্দ করেন। এদের মধ্যে শিশুসুলভ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় এবং হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করেন।
হাতের লেখার মধ্যে যদি প্রয়োজনীয় স্পেস সঠিকভাবে না থাকে তবে সে লেখা পড়তে যেমন অস্বস্তিকর মনে হয়, তেমনি লেখক সম্পর্কেও ভিন্ন ধরনের ধারণা পাওয়া যায়। হাতের লেখায় স্পেস কম থাকলে ধরে নেওয়া হয় তারা কোনো কাজ পরিকল্পনা মতো করতে পারেন না। সময় ও প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা অসচেতন। এরা অনেক সময় পরিকল্পনা ছাড়াই কাজে নেমে পড়েন। ফলে কাজ থেকে আশানুরূপ ফল পান না।
যাদের লেখার মধ্যে প্রয়োজনীয় স্পেস থাকে ধরে নেওয়া হয়, তারা পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করতে পছন্দ করেন এবং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। এরা স্বাধীনচেতা, যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে অন্যের কাছে কীভাবে তা সহজবোধ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় সে বিষয়ে সচেতন থাকেন।
অনেকে এক পৃষ্ঠায় লিখলে তার ছাপ পরবর্তী কয়েক পাতায় চলে যায়। এমন লেখা মানসিক অবসাদ কিংবা জেদের বহিঃপ্রকাশ। এরা কোনো বিষয়ে প্রতিজ্ঞা করলে তা রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কখনো কখনো এমন লোকেদের একগুঁয়ে প্রকৃতির হতে দেখা যায়। এদের কোনো কিছু বুঝাতে হলে যুক্তি ও বুদ্ধির প্রয়োগ করতে হয়।
কোনো কিছু লেখার সময় যদি তা ডানদিকে হেলে থাকে তবে তারা সাধারণত আবেগপ্রবণ ও বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে থাকেন। লেখা যদি কোনো দিকে হেলে না থেকে সোজা হয়, তবে তারা যথেষ্ট যুক্তিবাদী ও সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকেন। বাস্তবভিত্তিক চিন্তা ও পরিকল্পনা করতে পছন্দ করেন। আবেগ দিয়ে তারা পরিচালিত হন না। লেখার সময় যদি অক্ষরগুলো বাম দিকে হেলে থাকে তারা সাধারণত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকেন। সহজে অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারেন না। তাদের বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও কম হয়ে থাকে।যাদের লেখা খুবই হালকা হয় তাদের মধ্যে জীবনীশক্তির অভাব থাকতে পারে। আলস্য কিংবা খেয়ালীপনা লক্ষ্য করা যেতে পারে। এরা কোনো বিষয়ে পরিপূর্ণরূপে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।যাদের লেখার গতি বেশি তারা সাধারণত সময় সচেতন হয়ে থাকেন। দ্রুত চিন্তা ও কাজ করতে পছন্দ করেন। তবে, পরীক্ষার খাতায় শেষ সময়ের দিকে দ্রুত গতিতে লেখা ও প্রথম থেকেই দ্রুত গতিতে লেখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।বাচন কিংবা শব্দচয়ন: শৈল্পিক বাচন সাধারণকেও করে তোলে অনন্য, হয়ে ওঠেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মানব প্রকৃতির নিগুঢ় তত্ব উদঘাটন করা যায় বাচনের মাধ্যমে। একেকজনের বাচনভঙ্গি একেক রকম। কেউ দ্রুত কথা বলতে পছন্দ করেন আবার কারো পছন্দ ধীরে ধীরে কথা বলা। কারো পছন্দ অন্যকে খোঁচা দিয়ে কথা বলা, কারো বা পছন্দ অন্যকে অনুপ্রাণিত করা। খেয়াল করলে দেখা যাবে, যারা দ্রুত কথা বলেন তাদের মধ্যে মানসিক স্থিরতার অভাব থাকে। অনেক সময় গোপনীয় বিষয় এরা মনের অজান্তেই প্রকাশ করে ফেলে। অবচেতনে নিজের দুর্বল দিক প্রকাশ করে ফেলায় কখনো কখনো তা নিজের ক্ষতির কারণ হয়।যারা ধীরে কথা বলেন তারা যে কোনো বিষয় গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। যে কোনো জটিল বিষয় যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে সহজবোধ্য করে তুলতে পারেন।নাম মনে রাখা: এটি একটি ভালো গুণ। যদিও অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়ে খুব একটা সচেতন নন কিংবা নাম মনে রাখার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন না। কিছু লোক থাকে যারা আপনার নাম একবার শোনার পর তা মনে রাখে। পরবর্তীতে দেখা হলে নাম ধরেই সম্বোধন করে। এ ধরনের লোকেরা সাধারণত খুবই বুদ্ধিমান ও যোগাযোগে দক্ষ হয়ে থাকে। সংগঠক কিংবা নেতা হিসেবেও তারা সফল হন। এদের আরেকটি ভালো দিক হচ্ছে এরা সহজেই যে কারো সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।চোখে চোখ রেখে কথা বলা: কথা বলার সময় আই কন্ট্যাক্ট গুরুত্বপূর্ণ। যারা চোখে চোখ রেখে কথা বলেন তারা প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী হন। এরা যে কোনো উপায়ে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে সচেষ্ট থাকেন। এদের সঙ্গে মিথ্যা কিংবা ছলনার আশ্রয় নিলে ক্ষতিটা নিজেরই হয়।

লেখক: সাইকিক কনসালটেন্ট