বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মঙ্গলবার রাতে বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে সরকার। এটি গতকাল বুধবার বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে অনেকের মধ্যে।

নতুন পে-স্কেলের কয়েকটি বিষয় নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয় জানিয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মচারীরা। তাদের মতে, নতুন স্কেলের কোনো কোনো বিধানে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও বঞ্চিত করা হয়েছে ন্যায্য অধিকারের। তবে বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন হাতে পাওয়ার পর তা বিশ্লেষণ করে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তারা। এতে সমাধান না হলে তা নিরসনে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সুবিধা বঞ্চিতরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতে, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো অবস্থা করা হয়েছে নতুন পে-স্কেলে। জাতীয় অধ্যাপকদের সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা দেয়া আইনগত শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত সংখ্যক সিনিয়র অধ্যাপকদের গ্রেড-১ দিয়ে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনে সেটি উপেক্ষিত হয়েছে।

অন্যদিকে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতে, চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সরকারি কর্মচারীদের দাবি, অষ্টম পে-স্কেলে প্রায় ৩৪ বছরের পুরনো পদ্ধতি টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়ায় সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমের কাছে উল্লিখিত মন্তব্য করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধি। পাশাপাশি বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ সম্মিলিত সরকারি কর্মকর্তা (নন-ক্যাডার) পরিষদ (বাসসকপ)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বুধবার বলেন, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি বলেছেন, নিয়মিত অধ্যাপকদের মধ্য থেকে কিছু শতাংশকে সিনিয়র সচিবের মর্যাদা দিবেন। অর্থমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, জাতীয় অধ্যাপকরা থোক বরাদ্দ পান, সেজন্য সিনিয়র সচিব মর্যাদা তাদের দেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিনিয়র সচিব মর্যাদা দেয়া হয়েছে জাতীয় অধ্যাপকদের। সরকার অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দু’বছরের জন্য জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগ করেন। সুতরাং যারা সিনিয়র সচিব তাদের অবসরে যাওয়ার পর নিশ্চয়ই ওই পদে বসানো হয়নি। চাকরি থাকাকালীন তাদের বসানো হয়েছে। পে-রুলের মধ্যে যেসব অধ্যাপক আছেন তাদের কিছু অংশ সিনিয়র সচিব মর্যাদা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় অধ্যাপকরা পে-রুলের মধ্যে নেই। যা করা হয়েছে তা আইনগত শুদ্ধ নয় এবং আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ড. মাকসুদ কামাল আরও বলেন, জাতীয় অধ্যাপকদের মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। এজন্য তারা জাতীয় অধ্যাপক। তারা জাতীয় সচিব নয়। তাদের এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে এসে আমাদের আরও অপমান করা হয়েছে, যা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মনে করা হচ্ছে শিক্ষকরা বোকা তারা কিছু বুঝেন না। আমরা এটি গ্রহণ করব না।

এই শিক্ষক নেতা আরও বলেন, সপ্তম বেতন কাঠামোতে যেভাবে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে হুবহু পাবেন। এখন আমরা শুনছি এর ব্যত্যয় হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা তিনি যে কথাগুলো আমাদের বলেছেন সে কথাগুলোর প্রতিফলন হবে। প্রজ্ঞাপন আরও বিশ্লেষণ করা হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে। এ বিষয়ে আরও দেখেশুনে পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করব।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নন-ক্যাডার) যুগ্ম মহাসচিব জাকারিয়া হাসান বলেন, সপ্তম বেতন কাঠামোতে ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তা উভয়ে চাকরিতে প্রবেশ করতেন নবম গ্রেডে। কিন্তু অষ্টম পে-স্কেলে ক্যাডার কর্মকর্তাদের এক ধাপ উপরে তুলে চাকরির প্রবেশে অষ্টম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।

এতে নন-ক্যাডার ও ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে জাকারিয়া হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে- প্রশাসনে কোনো শ্রেণীবিন্যাস থাকবে না। কিন্তু এ পদক্ষেপের মাধ্যমে আরও বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি করা হয়েছে। আমরা পে-স্কেলে এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করছি। প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যদি দেখা যায় আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে, তাহলে এ বিষয়ে আইনের আশ্রয় নেয়া হবে।

এদিকে বুধবার রাতে বাংলাদেশ সম্মিলিত সরকারি কর্মকর্তা পরিষদ (বাসসকপ) লিখিত বিবৃতিতে বলেছে, ঐতিহাসিকভাবে ক্যাডার, নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় অভিন্ন প্রারম্ভিক বেতন স্কেলে যোগদান করে আসছেন। গত ৪৪ বছরে ৭টি পে-স্কেলে এ ধরনের বেতন বৈষম্য সৃষ্টি হয়নি। প্রচলিত প্রথা ও বিধি বিধান লংঘন করে সরকারি চাকরিতে নতুন করে শ্রেণীবৈষম্য সৃষ্টি আমলাদের গভীর চক্রান্তের শামিল। তারা গণতান্ত্রিক সরকারকে বিব্রত করতেই এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে বলে নেতারা মনে করেন। ঘোষিত ব্যবস্থা মানবাধিকার লংঘন ও সংবিধান পরিপন্থী এবং দেশের সব নন-ক্যাডার কর্মকর্তার জন্য মানহানিকর।

আগামী ২২ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বেলা ১১টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পে-স্কেলে বিদ্যমান অসঙ্গতি সম্পর্কে পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা প্রদানসহ পরবর্তী করণীয় ঘোষণা দেয়া হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সপ্তম বেতন স্কেলে ১ম শ্রেণীর জন্য ৪ বছর ও ১০ বছর পর, দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য ৪ বছর, তৃতীয় শ্রেণীর জন্য ৫ বছর ও চতুর্থ শ্রেণীর জন্য ১০ বছর পর টাইম স্কেল দেয়ার বিধান ছিল। পাশাপাশি প্রথম শ্রেণীর জন্য ৮ বছর পর, দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য ৮ ও ১২ বছর, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর জন্য ৮, ১২ ও ১৫ বছর পর সিলেকশন গ্রেড দেয়ার বিধান ছিল। কিন্তু নতুন পে-স্কেলে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করে প্রত্যেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য চাকরিকালীন ১০ বছর এবং ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুটি গ্রেড পরিবর্তন করার বিধান রাখা হয়।

Leave a Reply