বিরোধ মেটাতে রাজশাহীর নেতাদের সঙ্গে আজ বসছেন কাদের

রাজশাহী সংবাদদাতা : কোন্দল জর্জরিত রাজশাহী আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরোধ মেটাতে তাদের সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আজ সকালে ঢাকায় দলীয় কার্যালয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি। কাল শুক্রবার জেলা ও মহানগর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে বসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আগামী নির্বাচনের আগেই নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানায় দলের একটি সূত্র।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের পরস্পরের বিরোধ তুঙ্গে। মহানগর আওয়ামী লীগে তেমন দ্বন্দ্ব না থাকলে জেলায় নেতাদের মধ্যে দুটি বলয় তৈরি হয়েছে। একটি বর্তমান সংসদ সদস্যদের এবং অপরটি মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের। দলীয় কর্মসূচিতে দুই গ্রুপের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে বেসামাল বক্তব্য দিচ্ছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ রাজশাহীর নেতাদের অভিযোগ, দাবি-দাওয়া শুনবেন দলীয় সাধারণ সম্পাদক। সভার ফলাফল কাল শুক্রবার জানানো হবে সভাপতি শেখ হাসিনাকে। সেদিন সকালে শেখ হাসিনা জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।

ওমর ফারুক চৌধুরী রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য। আসছে নির্বাচনে এই আসনে মনোনয়ন-প্রত্যাশী আওয়ামী লীগের সাত নেতা। তাদের সঙ্গেও বিরোধ ওমর ফারুক চৌধুরীর। ফলে ওই সাত নেতা আসাদের অনুগত।

এভাবে রাজশাহী-৫ ও ৬ আসনেও বর্তমান সংসদ সদস্য ও আসাদুজ্জামান আসাদের দুটি বিরোধী পক্ষ তৈরি হয়েছে।

রাজশাহী-৪ আসনেও একই অবস্থা। তবে এই আসনটির সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আসাদের।

আসাদ নিজে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসন থেকে নির্বাচন করতে দলের মনোনয়ন চাইবেন। আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের সঙ্গে তুমুল বিরোধ তার। তবে ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে আয়েনের সম্পর্ক ভালো।

রাজশাহী-২ (সদর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। শরিক দলের সংসদ সদস্য থাকায় এখানে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নেই। বিরোধ নেই ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাদের সঙ্গেও। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-ওয়ার্কার্স পার্টি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। মেয়র পদে বিজয় নিশ্চিত হয়েছে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের। এই নির্বাচনে আসাদুজ্জামান আসাদও নৌকার পক্ষে ভূমিকা রাখেন।

রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হকের সঙ্গে বিরোধ বাগমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম সান্টু ও তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম আজাদের। আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন-প্রত্যাশী সান্টু ও কালাম এমপি এনামুলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এর আগে। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর সান্টু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ হারান। কিন্তু সান্টু-কালামসহ তাদের অনুসারীরা এখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তলে যাচ্ছেন।

রাজশাহী-৫ আসনেও বর্তমান সংসদ সদস্য কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন মনোনয়ন-প্রত্যাশী সাত নেতা। সম্প্রতি জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে তারা ওয়াদুদ দারাকে প্রতিরোধের ঘোষণা দেন।

ওই অনুষ্ঠানে আসাদুজ্জামান আসাদ সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ দারাকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘আপনাদের বলে দিতে চাই, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে বিক্রি করে কেউ যদি টাকার মালিক হন, আর যা-ই হোক তাকে জননেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়ন দেবেন না। মাঠে-ময়দানে বক্তৃতা করার দরকার আছে বলে মনে করি না, শেখ হাসিনা এই অপদার্থদের তথ্য সংগ্রহ করেছেন।’

রাজশাহী-৬ আসনে আবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে লড়তে চান বর্তমান সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তিনি ছাড়াও এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রায়হানুল হক, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলু, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বাঘা পৌরসভার মেয়র আক্কাস আলীসহ কয়েকজন। তারা আসাদুজ্জামান আসাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

দলীয় নেতারা জানান, জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার আশায় বিভিন্ন আসনের নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বিরক্ত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। হাইকমান্ড মনে করে, এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে এসব নেতার সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলাটাও প্রয়োজন মনে করেছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল। কোন্দলে জর্জরিত নেতাদের পরস্পরের মান-অভিমান ভাঙানো ও নৌকা প্রতীকের জন্য কাজ করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে তাদের ঢাকায় ডাকা হয়েছে।

তবে কেন্দ্রে তাদের ডাকাকে সাংগঠনিক রুটিন ওয়ার্ক বলে দাবি করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। তিনি বলেন, সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা করার জন্য জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগকে ডাকা হয়েছে। সংগঠনের প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধান নেত্রীকে দিতে হবে। সংসদ নির্বাচনের আগে এটা রুটিন ওয়ার্ক।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, আসছে নির্বাচন উপলক্ষে এই সভা ডাকা হয়েছে। সভার ফলাফল পরদিন শুক্রবার দলের সভানেত্রীকে জানাতে হবে। সেদিন তিনি শুধু জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক করবেন।