‘বাজেটে ব্যাংকিং খাতের লুটপাট বন্ধে পদক্ষেপ নেই’

প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকিং খাতের লুটপাট বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ। বলেছেন, ‘ব্যাংকে গচ্ছিত জনগণের টাকা লুটপাট করে আবার জনগণের করের টাকা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটানো হচ্ছে- এটা জোচ্চুরি। এ ব্যাপারটি নিয়ে অর্থমন্ত্রী বাজেটে একটি কথাও বলেননি।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর নীলক্ষেতে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) আয়োজিত বাজেটোত্তর আলোচনায় এসব কথা বলেন ইব্রাহিম খালেদ।
ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘এখন ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ৬০ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকের ৪০ শতাংশ ঋণই খেলাপি। এত খেলাপি ঋণ নিয়ে পৃথিবীর কোথাও ব্যাংক টিকতে পারে না। বেসিক ব্যাংক লুটপাটের সময় মানুষের চিৎকার তাদের (সরকার) কানে যায়নি। তাহলে কি সরকার নিজেই লুটপাট করতে চায়? সরকারই যদি ব্যাংক লুট করে তাহলে যাবো কোথায়?’
ব্যাংকের দুর্নীতি বন্ধে কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ লুটপাট বন্ধে ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ কমিশনের পর আর কোনো কমিশন হয়নি। এভাবে ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে না।’
আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ প্রসঙ্গে ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘বাজেট দেয়া হয় জনগণের জন্য। ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ করার পর দেশের ১৬ কোটি মানুষ বিরোধিতা করল। এমনকি সংসদ সদস্যরাও বিরোধিতা করলেন, কিন্তু অর্থমন্ত্রী পাত্তা দেননি। প্রধানমন্ত্রী যখন বললেন, তখন অর্থমন্ত্রীর সুর পাল্টে গেল। ১৬ কোটি লোক বললো শুনলেন না, প্রধানমন্ত্রী বলার পর শুনলেন। এটা হতে পারে না।’
আবগারি শুল্কের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যখন ১৯৯১ সালে আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয় তখন ব্যাংক ঋণের সুদ ছিল ১২ শতাংশ। সুদ আয় থেকে ১৫০ টাকা কাটলে গ্রাহক তা বুঝতো না। এখন ঋণের সুদ ৪-৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশ। অর্থাৎ কেউ ব্যাংকে টাকা রাখলে তার প্রকৃত মূল্য কমে যাচ্ছে। তাছাড়া মানুষ তো আয়ের ওপর ট্যাক্স দিয়ে তার অর্থ নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকে জমা রাখছে। এক্ষেত্রে আবগারি শুল্কের ফলে তা করের ওপর কর (ডাবল ট্যাক্স) আরোপ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত হবে।’
সিপিডির ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্য সচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কমিশন গঠন করে ব্যাংকিং খাতের দুর্বৃত্তদের শাস্তি দেয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘বাজেটের লক্ষ্য হচ্ছে সম্পদ পুনর্বন্টন। আবগারি শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তা প্রতিফলিত হয়নি। এখানে ধনী-গরিব বৈষম্য করা হয়েছে। একজন মধ্যবিত্ত এক লাখ টাকা রাখতে তাকে দশমিক ৮ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। আর যে পাঁচ কোটি টাকার বেশি রাখছে তাকে দশমিক ০৫ শতাংশ আবগারি শুল্ক দিতে হচ্ছে। সম্পদ পুনর্বন্টনের মাধ্যমে শুল্ক আরোপ করা হলে পাঁচ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের আমানতকারীকে চার লাখ টাকা ট্যাক্স দিতে হতো।’
ফরেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজের সভাপতি রূপালি চৌধুরী বলেন, ‘বাজেটকে শুধু ট্যাক্স আদায়ের টুলস (হাতিয়ার) হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যবসা-বাণিজ্যের নীতি সহায়তার দিক থেকে দেখতে হবে।’
আইসিএমএবির সাবেক সভাপতি আরিফ খান বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য নতুন কিছু নেই। এটা সম্ভবত নীতি-নির্ধারকদের পুঁজিবাজার সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে হয়েছে। পুঁজিবাজারের স্বার্থে করপোরেট ট্যাক্স কমাতে নীতি-নির্ধারকরা সম্মত হলেও পরে পিছিয়ে যান। এবারে বাজেটে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অথচ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে করপোরেট ট্যাক্স বেশি।’
আইসিএমএইবি’র সভাপতি জামাল আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওউপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি আবদুর রহমান খান।