বাগেরহাটের চিতলমারীতে যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু

এম শিমুল খান, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : বাগেরহাটের একটি গ্রামে মোসাদ শেখ (৩৫) নামে এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনা হত্যা, নাকি সাধারণ মৃত্যু এ নিয়ে এলাকায় রয়েছে নানান গুঞ্জন। পরিবারের অভিযোগ জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজন মোসাদ শেখকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তার লাশ বাড়ীর পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। ঘটনার তদন্তে পুলিশের গাছাড়া ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এ ঘটনায় চিতলমারী থানায় মোসাদ শেখের বড় ভাই আসাদ শেখ বাদী একটি অপমৃত্যু মামলা (মামলা নং-৭, তারিখ-১০.০৫.১৮) দায়ের করেন।
অপরদিকে, মামলায় ফাঁসাতে একটি স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যা বলে চালানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ প্রতিপক্ষের। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে গ্রামবাসী। এ ঘটনায় বর্তমানে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে। বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ীর সামনে থেকে গুরুতর অবস্থায় মোসাদ শেখকে উদ্ধার করে চিতলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন। মোসাদ শেখ জেলার চিতলমারী উপজেলার আমবাড়ী গ্রামের মো: আউয়াল শেখের ছেলে।
শুক্রবার সরেজমিনে আমবাড়ী গ্রাম পরিদর্শনকালে মোসাদ শেখের বন্ধু আলামীন শেখ (৩৫) বলেন, ঘটনার দিন রাত ১১টার দিকে জমি-জমা সংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে আমি কথা বলার জন্য মোসাদ শেখ ও আরেক বন্ধু জ্যোতিষ বিশ্বাস (৪৫) কে নিয়ে কলাতলা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিদ্দিকুর রহমানের বাড়ীতে যাই। সেখানে অন্য একটি সালিশী বৈঠক চলছিল দেখে আমরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে বাড়ীতে ফিরে আসার জন্য রওনা হই। পথিমধ্যে আমি এবং জ্যোতিষ যার যার বাড়ীর পথে চলে যাই। মোসাদ শেখ তার বাড়ীর উদ্দেশ্যে ভিন্ন পথে রওনা হন। কিছুক্ষণপর লোকজনের ডাক চিৎকার শুনতে পেয়ে গিয়ে দেখি মুুমূর্ষ অবস্থায় তাদের বাড়ীর উঠানে পড়ে আছে মোসাদ। এ সময় স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ডা: অলিয়ার কে ডেকে আনা হয়। তখন ডা: অলিয়ার মোসাদকে দেখে দ্রুত তাকে চিতলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে বলেন। আমরা দ্রুত তাকে সেখানে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন।
এ ব্যাপারে নিহত মোসাদের বাবা অতশিপর বৃদ্ধ আওয়াল শেখ (৮০) বলেন, আমার বাড়ীতে ঢোকার পথে জঙ্গলের মধ্যে শাহজাহান সরদারের লোকজন পুর্ব থেকে ওত পেতে থেকে আমার ছেলের উপর আক্রমন করে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর আমার বাড়ীর উঠানে ফেলে চলে যায়। লোকজনের পায়ের শব্দ পেয়ে আমরা বাইরে এসে দেখি আমার ছেলে মোসাদ উঠানে পড়ে আছে। পরে আমার বাড়ীতে ঢোকার মুখে ওই জঙ্গলের পার্শ্বে মোসাদসহ তিন জনের পায়ের স্যান্ডেল উদ্ধার করা হয়। মাটিতে সেখানে আমরা বেশ কিছু মানুষের পায়ের চিহ্ন দেখতে পাই। আমি মনে করি আমার ছেলেকে প্রতিপক্ষ শাহজাহান সরদারের লোকজন শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে হত্যার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।
এ ব্যাপারে আমবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন যাবত মোসাদের বাবা আওয়াল শেখের সাথে স্থানীয় প্রভাবশালী শাহজাহান সরদারের ১ একর ৪০ শতাংশ জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব ও মামলা চলে আসছিল। এরই জের ধরে গত ৪ মাস আগে শাহজাহান সরদার লোকজন নিয়ে মোসাদের বাড়ীর সামনের ওই জমি দখল করে নেয় এবং জমির ধান কেটে নিয়ে গিয়ে সেখানে নতুন বসতি স্থাপন করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারন করে। এ ঘটনার জের ধরে মোসাদকে হত্যা করা হতে পারে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে আমবাড়ী গ্রামের কৃষক বিবেকানন্দ বিশ্বাস (৫৫) বলেন, আমার জমির চারপাশ দিয়ে শাহজাহান সরদার ঘের কেটে মাছ চাষ করছেন। আমি এর প্রতিবাদ করি। এতে উনি ক্ষিপ্ত হয় আমাকে ৭ দিনের মধ্যে মাটিতে পুতে ফেলার হুমকি দেন। আমি বর্তমানে পরিবার পরিজন নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছি। মোসাদের মৃত্যুর পরও শাহজাহান সরদারের লোকজন বাড়ী থেকে পালিয়ে গেছে। এতে কি প্রমাণ হয় না মোসাদকে কারা হত্যা করেছে।
এ ব্যাপারে চিতলমারী উপজেলা কৃষকলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী নাজমুল হক টিপু বলেন, শাহজাহান সরদার আমবাড়ী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে আসছে। তার হাত থেকে এলাকার সংখ্যালঘুদের জানমাল ও সম্পত্তি নিরাপদ থাকছে না। মোসাদ শেখ এলাকায় একজন ভাল ছেলে হিসাবে পরিচিত। সে বিভিন্ন সময়ে শাহজাহান সরদারের বিভিন্ন অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করে আসছে। এছাড়া শাহজাহান সরদার গায়ের জোরে তার লোকজন দিয়ে মোসাদের পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করে নেয়। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি বাগেরহাট জেলা গোয়েন্দা অফিসে মোসাদের নামে একটি অভিযোগ করেন শাহজাহান সরদার। বাগেরহাট গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে ১০ এপ্রিল সকাল ১০টায় তাকে উপস্থিত থাকার জন্য নোটিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই মোসাদকে হত্যা করা হয়। ঘটনা তদন্তে পুলিশের গাছাড়া ভূমিকায় এবং মামলা গ্রহণে টালবাহানায় আমরা উদ্বিগ্ন। এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে আমিও মোসাদ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবী করছি।
এ ব্যাপারে চিতলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা: রুমানা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ওইদিন জরুরী বিভাগে দায়িত্বে ছিলাম। রাত আনুমানিক ১টার দিকে মোসাদকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। আমি মোসাদকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তেমন কিছু দেখতে পাইনি। হৃদ যন্ত্রেরক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে আমার ধারনা।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শাহজাহান সরদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি দলিল মুলে ওই সম্পত্তির মালিক। আওয়াল শেখ দীর্ঘদিন যাবত আমার জমি ভোগ-দখল করে আসছিল। এ নিয়ে কয়েকবার সালিশী বৈঠক হয়। তারা জমির কোন বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এ নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে এ সময় তিনি আরো বলেন, আমি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শুনেছি মোসাদ হৃদযন্ত্রের ক্রীয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে। আমার লোকজন তাকে হত্যা করবে কেন। আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতে একটি স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যাকান্ড বলে চালানোর অপচেষ্টা চলছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বের হবে।
এ ব্যাপারে চিতলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুকুল সরকার বলেন, সুরতহাল রিপোর্টে মোসাদের শরীরের কোন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন নাই। ময়না তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। সে সময় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তবে মোসাদের পরিবারের সাথে স্থানীয় একটি গ্রুপের জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে পুর্ব শত্রুতা ও মামলা ছিল। তবে কিছুটা ধারনা করা হচ্ছে এ সংক্রান্ত ব্যাপারে মার্ডার হতেও পারে। এ ব্যাপারে অধিক তদন্ত প্রয়োজন। আমি ইতিমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তাকে অধিক তদন্তসহ আলামত জব্দের নির্দেশ দিয়েছি। এ ঘটনায় মোসাদের বড় ভাই আসাদ শেখ নিজে বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে। তবে যদি এটা হত্যাকান্ড হয়ে থাকে তাহলে দোষিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।