বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি থেকে মিয়ানমারকে শিক্ষা নেয়ার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

ঢাকা, ৭ মে, ২০১৮ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিদ্যমান ধর্মীয় সম্প্রীতি থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য মিয়ানমারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য বজায় রেখে দেশ কিভাবে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার সেই শিক্ষা নেবে।’
রোববার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বৌদ্ধ ধর্মী কল্যাণ ট্রাস্ট এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, বৌদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান সুপ্ত ভুবন বড়ুয়া, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, বৌদ্ধ সংঘ নায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরো, উপ সংঘ রাজ সত্যপ্রিয় মহাথেরো, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব উত্তম কুমার বড়ুয়া, ইউরোপিয়ান স্কুল অব ল’ ইন লন্ডনের ডীন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দয়াল কুমার বড়ুয়া অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
এর আগে বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ফুলের তোড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান।
বৌদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান সুপ্ত ভূষণ বড়ুয়া প্রধানমন্ত্রীকে মহামতি বুদ্ধের একটি ভাস্কর্য উপহার দেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব উত্তম কুমার বড়ুয়া বঙ্গবন্ধুর একটি তৈলচিত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
ট্রাস্টের পক্ষ থেকে দয়াল কুমার বড়ুয়া মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ৫ লাখ টাকার একটি চেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা জনগণের তাদের জন্মভূমিতে বসবাস করার অধিকার সুরক্ষিত হতে হবে এবং তাদেরকে সেখানে বাস করার জন্য সার্বিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, যেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে এবং এর ফলে ব্যাপক সংখ্যক রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসে।’
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার রোহিঙ্গা জনগণকে আশ্রয় প্রদানের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তিনি বলেন, ‘আমরা দাবি করতে পারি, আমরা তাদেরকে কেবলমাত্র আশ্রয়ই দিইনি, সেখানে যাতে কোন প্রকার সংঘর্ষ বা সহিংসতা ঘটতে না পারে সেজন্য আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করি।’
রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়া হয়েছে, এ কথা পুনরুল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে কোন প্রকার দ্বন্দ্বে যায়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং বিশ্বের সকল দেশ এ ব্যাপারে সাধুবাদ জানাচ্ছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, কোন ধর্মেই সংঘর্ষ বা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির স্থান নেই। কিন্তু কখনো কখনো দুর্ভাগ্যজনভাবে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। তিনি ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রামু, উখিয়া ও কক্সবাজারের ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তখন আপনারা এরকম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির শিকার হন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ৯ মাসের মধ্যেই সব ধর্মের স্বাধীনতা দিয়ে একটি সংবিধান উপহার দেন, যাতে ধর্মনিরপেক্ষতাকে চার মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই আলোকে তিনি বলেন, ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে সম্মান ও মর্যাদার সাথে জনগণের বিশ্বাস স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করবে। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা দাবি করতে পারি, দেশে আমরা এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী মন-মানসিকতা বড় এবং যথাযথ অধিকার নিয়ে দেশে বসবাস করতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, আপনারা কখনো নিজেদেরকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে ভাববেন না। আপনারা সবসময় আপনাদের অধিকার সম্পর্কে মনে করবেন, এ দেশ ও মাটি আপনাদের। শেখ হাসিনা বলেন, আপনি আপনার মন ছোট করলে মন ছোট হয়ে যাবে। আপনাকে আপনার মন বড় করতে হবে। আপনি মন বড় করলে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। স্বাধীনতার উদ্দেশ্যই ছিল সকল ধর্মের লোক সুন্দরভাবে জীবন-যাপন করবে এবং প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবে।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছিল। সে সময় রাষ্ট্রীয় মদদে দেশের অনেক স্থানে সন্ত্রাস করা হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু লোক নিহত হয়। তাদের বাড়ি-ঘর এবং সহায় সম্পত্তি ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে একটি ক্ষুধামুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গড়তে বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ সকল ধর্মের লোকদের সহায়তা কামনা করেন। তিনি দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করে বলেন, আমরা লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিকভাবে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। তিনি এ সাফল্য ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে সকলের প্রতি আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্পদায়ের লোকদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বুদ্ধের অহিংসার বাণী অনুসরণ করে দেশের অগ্রগতি নিশ্চিতকরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে সকলের প্রতি আহবান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বুদ্ধের শিক্ষা অনুসরণ করে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তিনি বলেন, গৌতম বুদ্ধ তাঁর সারা জীবন সমতা, বন্ধুত্ব, আত্মত্যাগ, ক্ষমা এবং অহিংসার বাণী প্রচার করেছেন। তিনি শান্তির বাণী প্রচার করেছেন এবং দুস্থ মানুষের সেবা ও তাদের কল্যাণে কাজ করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি আরো বলেন, একটি আদর্শ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে তার শিক্ষার এখনো গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।