বর্মাকে রোহিঙ্গা মুসলিমমুক্ত করার চক্রান্ত মগরা ছাড়েনি

বিএনএস : মগ মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে ঢাকায় সফরকালে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আশ্বাস দিলেও সেদেশের প্রশাসন রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করছে। ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাবনা দেয়ার পরবর্তী দিন থেকে শুরু করে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের  গ্রামে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আতংক সৃষ্টি করে রেখেছে। ফলে আরও তিন হাজারের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, বুথিডং উপজেলার নারাইংশং, রোইঙ্গাদং, চিন্দং, ওলাফে, কুইন্দাং মগনা পাড়া রাজাবিড়া, দাব্রিঅং, চাংগ্রি পাড়াসহ বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা পল্লীতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নারীদের শ্লীলতাহানী করেছে মগসৈন্যরা। ফলে প্রাণ ও ইজ্জত আব্রু রক্ষার তাগিদে বাংলাদেশে আশ্রয়ের আশায় পাড়ি জমিয়েছে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা।
এছাড়াও ২০টি দেশের কূটনীতিকদের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আরাকানের অংশবিশেষ ঘুরে দেখানো হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। সেখানে মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সাথে কথা বলেন তারা। তবে রোহিঙ্গাদের সেনা তান্ডবের কোন কথা কূটনীতিকদের সামনে না বলার জন্য আগে থেকে সতর্ক করে দেয়া হয়। কেউ মুখ খুললে তাকে প্রাণ নাশের হুমকিও দেয় প্রশাসন।
কূটনীতিকদের দেয়া যৌথ বিবৃতিতে তারা আরাকানে পুড়ে যাওয়া রোহিঙ্গা গ্রামগুলো দেখেছেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। একই সাথে বার্মাকে আবারো এ বর্বরতা থামানোর আহ্বান জানান।
এদিকে আরোও অভিযোগ পাওয়া গেছে, থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবশিষ্ট মানুষকে তাড়িয়ে দিতে রাখাইনে দ্বিগুণ শক্তিতে অভিযান শুরু করেছে বর্মী প্রশাসন। এতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকা রোহিঙ্গা স্রোত আরও জোরালো হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই থাকা ৯ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে সেখানকার অবশিষ্ট ৩ লাখ রোহিঙ্গা যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১২ লাখে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।
মিয়ানমার সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ঘোষণা দিলেও রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা বলছেন, পশ্চিম রাখাইনে থেকে যাওয়া অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করতে মগ সেনারা ফের তান্ডব শুরু করেছে। তাদের তাড়িয়ে দিতে দ্বিগুণ জোরদার হয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, বহু গ্রাম এখন একেবারেই জনমানবশূন্য। প্রতিদিন বাংলাদেশের সীমান্তে ছুট আসছে হাজার হাজার মানুষ। বাংলাদেশে পালিয়ে আসার জন্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষ নাফ নদীর কিনারায় দাড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করতে থাকে। অনেকেই অর্থের অভাবে নৌকাযোগে সীমান্ত পাড়ি দিতে না পারা ছোট নদী ধরে সাতার কেটে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্ঠা করছে।
আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গারা এবার ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌকায় করে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশ পাড়ি দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে করে দুর্ঘটনার আশংকা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রাতের আঁধারে নাফনদী পাড়ি দিচ্ছে। এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, গত কয়েক দিন ধরে শাহপরীরদ্বীপ থেকে কোন ফিশিং ট্রলার মিয়ানমারের উপকুলে রোহিঙ্গা পরিবহনের জন্যে যাতায়াত করেনি। ওপারে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু বড় ফিশিং ট্রলার না পেয়ে নিরুপায় হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌকায় করে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশ পাড়ি দিচ্ছে। শাহপরীরদ্বীপের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক জাহেদ হোসেন বলেন ‘হঠাৎ করে এখন রাতের আঁধারে ছোট ছোট নৌকায় করে মিয়ানমারের মংডু শহরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুরা পালিয়ে আসছেন। এখন যারা আসছেন তারা মালামালও সঙ্গে করে নিয়ে আসছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গারা সঙ্গে করে সৌর বিদ্যুৎ এর সোলার প্যানেল সাথে নিয়ে আসছে’। শাহপরীরদ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন ‘রোহিঙ্গারা প্রথম দিকে দিনের বেলায় আসত। কিন্তু এখন রাতের আধাঁরে নাফনদী অতিক্রম করে রোহিঙ্গারা আসছে। ছোট ছোট নৌকায় করে সন্ধ্যার পর পরই রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিতে আসার হিড়িক পড়ে’।
রোহিঙ্গাদের নাফনদীতে পাড়িতে সহায়তাকারী নৌকার মাঝি রহমত উল্লাহ বলেন ‘প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের নৌকায় করে নাফনদী পারাপার করে আসছি। মিয়ানমার পুলিশ (বিজিপি) আমাকে কিছু করে না। প্রতি টিপে তাদেরকে ৫০ হাজার দিয়ে থাকি। ওপার থেকে এপারে আসতে ১ ঘণ্টা সময় লাগে। মংডু থেকে বুচিডংয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের মতো। সেখানে ৩২০টির মতো গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাস। আগস্টের শেষের দিক থেকে রোহিঙ্গাদের চলে আসা শুরু হলেও টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল অনেকেই। কিন্তু বর্মী প্রশাসনের অব্যাহত নির্যাতনে তারাও এখন চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। কেননা গত এক মাস ধরে এলাকার লোকজনকে চলাফেলা করতে দিচ্ছে না। ফলে সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে’।
মিয়ানমারের মংডুর খইল্যাভাঙ্গা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নবী হোসেন, আজিজুল রহমান ও আহমদ আলী বলেন, ‘জীবন বাঁচাতে এখানে পালিয়ে এসেছি। সেনাবাহিনী আমাদের বাড়িঘর পুঁড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামে কোন রোহিঙ্গাদের থাকতে দিচ্ছে না। ভালো কাঠের তৈরি ঘরগুলো দখল করে নিচ্ছে। দিনের বেলায় প্যারাবনের পাশে নৌকার মাঝিদের ঘরে অবস্থান নিতে হচ্ছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা ধান ক্ষেতে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যার পর নৌকায় করে নাফনদী পাড়ি দিতে হচ্ছে রাতের আঁধারে। এমন সময় নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটলে প্রচুর লোক মারা যাবে’। তারা আরও বলেন ‘সেনা সদস্যরা মুসলিমদের ঘরবাড়ি দখল করে নিচ্ছে। এসব থেকে রক্ষা পেতে অনেক ব্যবসায়ী বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন। পালিয়ে আসা ব্যবসায়ীদের গরু-শুঁটকি, আচারসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বাড়ি রক্ষা করতে আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে ১৩ কোটি কিয়েট দিয়েছে। এরপর কি হবে আর জানি না। বাংলাদেশ থেকে বড় বড় ফিশিং ট্রলার যাচ্ছে না। এদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জীবন-যাপন দূর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তাই নিরুপায় হয়ে ঝুঁকি নিয়ে হলেও ছোট নৌকায় করে বাংলাদেশে চলে এসেছি’।
সাবরাংয়ের ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন ‘সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোররাত পর্যন্ত নাফনদী অতিক্রম করে প্রায় সাড়ে চার হাজারের মতো রোহিঙ্গা এসেছে। টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা ছোট ছোট দলে নৌকায় করে রাতের আঁধারে নাফনদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে
এদিকে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বেশ কিছু নারী ও শিশু নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্যাম্প এলাকায় মাইকিং করা হয়। ‘নিখোঁজ সংবাদ’ প্রচার করতে মাইকিংসহ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। কেউ হারিয়ে গেলেই কুতুপালং ক্যাম্পে বর্মি ভাষায় মাইকিং করা হয়। নিয়মিত মাইকিং করেন নজির আহমদ নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা। তিনি বলেন ‘প্রতিদিন অন্তত চার-পাঁচ জন অল্পবয়সী নারী ও শিশুর নিখোঁজের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই সংবাদ আমরা মাইকে প্রচার করছি’। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শুরুর দিকে এই অভিযোগ বেশি থাকলেও এখন তা অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেওয়ার পর নিখোঁজের সংখ্যা অনেকাংশেই কমে গেছে। শিশু ও নারী পাচার রুখতে কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে ২৭টি তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। কোথাও পুলিশ, কোথাও সেনাবাহিনী আবার কোথাও বিজিবি চৌকিতে দায়িত্ব পালন করছে। জানা যায়, গত এক মাসে রোহিঙ্গাদের নিয়ে দালাল চক্রের নানা প্রতারণার অভিযোগে ২৫০ জনকে সাজা দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া বিভিন্ন পয়েন্টে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার ছাড়ার সময় ২৮ হাজার জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে ক্যাম্পে। তবে স্রোত নামার দুই সপ্তার মাথায় অন্তত অর্ধলাখ রোহিঙ্গাকে দালাল চক্র বিভিন্ন কৌশলে কক্সবাজার-ছাড়া করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন ‘ছদ্মবেশে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার পথে উখিয়া থানা পুলিশ অন্তত সাড়ে ৪ হাজার রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। পরে তাদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে উখিয়া ছাড়তে চেয়েছিল। অনুসন্ধান চালিয়ে ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েকজন পাচারকারীকে আটক করেছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফের অস্থায়ী ক্যাম্পের প্রায় দেড় হাজার রোহিঙ্গা যুবতী, নারী ও শিশু নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জনকে উদ্ধার করে তাদের স্বজনদের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে সহস্রাধিক। উখিয়ার কুতুপালং, টিভি টাওয়ার পাহাড়, বালুখালী, মাইন্যার ঘোনা, তাজনিরমার খোলা, হাকিমপাড়া, থাইংখালী, তেল খোলাসহ অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারী-শিশু পাচারকারীদের ঘাঁটি ছিল। সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই চক্রটি এখন গা ঢাকা দিয়েছে।
ক্যাম্পে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ :
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোন অপ্রীতিকর ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যত্রতত্র স্থাপিত ইবাদত খানা, পাঠশালাসহ সকল অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে সেসব স্থানের কথা উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর কাছে যেতে হবে বলেও নির্দেশনায় বলা হয়েছে। কোন মহল যাতে রোহিঙ্গাদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহার করতে না পারে সে দিকটাও নজরদারিতে রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বুধবার রাত ৮টার দিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় এই নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন।
নোটিশে আরও বলা হয়- দিনের বেলায় কাজ শেষে সূর্যাস্তের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত সকল দেশি বিদেশি এনজিও, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ সকলকে ক্যাম্প ত্যাগ করতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মসজিদ, মাদরাসাসহ কোনো প্রতিষ্ঠান করতে অবশ্যই সেনাবাহিনীর অনুমতি লাগবে। উক্ত সমন্বয় সভায় অন্যান্যদের মধ্যে জেলা প্রশাসন, সেনা বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ প্রশাসন ও দেশি বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Inline
Inline