ফেসবুক-ভাইবার বন্ধই কি একমাত্র সমাধান?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যোগাযোগের নতুন এক বাতায়ন। বেশিদিন আগের কথা নয়, তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে এই মাধ্যমটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, ট্যাঙ্গো, স্কাইপ ইত্যাদি। ইন্টারনেট প্রটোকলভিত্তিক এসব ম্যাসেজিং কিংবা টেলিফোন সেবা যোগাযোগকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মুঠোফোনে ইন্টারনেট সেবা থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই মাধ্যমগুলো অপরাধী কিংবা অপরাধ জগতের মানুষ ‘নিরাপদ’ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

নিরাপদ বলার কারণ, এখন পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টরা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। যে কারণে বারবারই অপরাধ দমনে এই মাধ্যমগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বুধবারও যুদ্ধপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পর প্রথমে বন্ধ করে দেয়া হয় ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। তার খানিক বাদেই বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেটও।

গত বুধবার সংসদ অধিবেশন চলছিল। সাংসদ হাজী সেলিমের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সাইবার ক্রাইম বন্ধে প্রয়োজনে ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করা হবে। এ ধরনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলেও জানান তিনি। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এই মাধ্যমগুলো বন্ধ করে আদৌ কি অপরাধ দমন সম্ভব? অপরাধীদের সংখ্যা কখনই বেশি নয়। মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু ব্যক্তির জন্য সাধারণ ব্যবহারকারীদের প্রযুক্তির সুবিধা-বঞ্চিত করার চিন্তা কি সঠিক? ফিরে যাই কদিন আগে। তখন বিএনপির টানা তিন মাসের অবরোধ চলছিল।

শোনা গেল, বিএনপি নেতারা নাশকতার ছক এবং নির্দেশনা দিচ্ছেন ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, ট্যাঙ্গো ব্যবহার করে। যাতে কেউ তাদের পরিকল্পনার ব্যাপারে জানতে না পারেন। বন্ধ করে দেওয়া হয় ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপসহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় ম্যাসেজিং অ্যাপ্লিকেশন। এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও রয়েছে সমালোচনার ঝড়। কিন্তু আদৌ কি সেটা পুরোপুরি বন্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে? কায়দা করে ঠিকই ভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা হয়েছে অ্যাপ্লিকেশনগুলো। পরে অবশ্য বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) বেশিদিন অ্যাপ্লিকেশনগুলো বন্ধ রাখতে পারেনি, সম্ভব হয়নি।

মাথা ব্যথা হয়েছে বলে কেটে বাদ দেওয়া তো সমাধান নয় বরং ওষুধ খেতে হবে। যা করলে সেরে যাবে তাই করতে হবে। এখন যদি সরকার মনে করে অপরাধীরা ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছে তাহলে এসব মাধ্যমের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই নজরদারি বাড়ানোর সক্ষমতা কি আমাদের আছে? যদি না-ই থাকে তাহলে কীভাবে নিজেদের সক্ষম করে গড়ে তোলা যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এমন তো নয় যে এটি পুরোপুরি অসম্ভব কোনো কাজ।

ইন্টারনেট সংক্রান্ত কার্যকলাপের নিয়ন্ত্রণ বিটিআরসির হাতে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি কতটুকু সক্ষম সাইবার ক্রাইম বা অপরাধ দমনে? অপরাধ দমন করতে হলে প্রয়োজন নজরদারির। বিটিআরসির কি সেই আয়োজন আছে? নেই। এমনকি ফেসবুকের জনপ্রিয় সাইটের কার্যকলাপের ওপরও কোনো নজরদারি কিংবা নিয়ন্ত্রণ নেই প্রতিষ্ঠানটির।

বিশ্বের অনেক দেশেই চালু আছে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, স্কাইপসহ নানা সেবা। সেখানেও যে সাইবার ক্রাইম হচ্ছে না, নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দমনে নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চয়ই আছে। যেটা তারা নিজেদের নাগরিকদের স্বার্থেই নিশ্চিত করেছে। বিটিআরসিরও উচিত হবে সক্ষমতা বাড়ানো। কীভাবে সাইবার ক্রাইমের হাত থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা যায় সেই কৌশল বের করতে হবে। সেই প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। তা না হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে দাঁড়িয়ে বলতেই হবে, ‘সাইবার ক্রাইম বন্ধে প্রয়োজনে বন্ধ করা হবে ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ।’ প্রযুক্তির বিকাশের মাহেন্দ্রক্ষণে যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর অযাচিত নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে একটিবার ভেবে দেখার সুযোগ কি নেই?

Leave a Reply