পুলিশের কোনো সাধ-আহ্লাদ নেই

অন্য চাকরির সাথে পুলিশের চাকরির যে আকাশ পাতাল ব্যবধান তা সাধারণ জনগণ কখনোই বিশ্বাস করে না। বিশেষ করে ডিউটি টাইম নিয়ে। তারা মনে করে অন্যান্য চাকরিতে যেমন একটা নির্দিষ্ট ডিউটি টাইম থাকে তেমনি পুলিশের বেলায়ও। ডিউটি শেষ, তারপর যেখানে ইচ্ছা যাবে, ঘুরে বেড়াবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

পুলিশ যে ২৪ ঘণ্টা অনডিউটিতে থাকে এটাও অনেকে বিশ্বাসই করে না। অন্য চাকরিজীবীরা শুক্র-শনি বা সরকারি ছুটি পাচ্ছে, অতিরিক্ত ডিউটি করলে ওভার টাইম পাচ্ছে। পুলিশের কথা বললে বলে, পুলিশের নাকি সুযোগ-সুবিধার অভাব নাই। ২৪ ঘণ্টা অনডিউটির কথা বললে তারা মনে করে এটা জাস্ট কথার কথা অথবা পুলিশের একটা চাপাবাজি।

আপনার কাছে যে থানা বা পুলিশ ব্যারাকগুলো আছে একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন না কতটা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে তারা। যদি কারো পরিচিত বন্ধু-বান্ধব এই পেশায় থাকে জাস্ট একটা দিন তার সাথে সময় দেন, দেখেন তার ঘুম, খাওয়া-দাওয়া, পরিবারকে সময় দেয়ার কোনো টাইমটেবল আছে কি না। যদিও এ ঘটনাগুলো হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। এগুলো পুলিশের নিত্য দিনের ঘটনা। শুধুমাত্র দেশের জন্য, পেশার জন্য সবকিছু নীরবে সেক্রিফাইস করছে তারা।lady police

অন্য সবার মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের পাওয়া যায় না। দিনের পর দিন বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনদের থেকে দূরে থাকতে থাকতে একটা সময় তাদের কাছে নিজ দেশে পরবাস ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনদের কাছে তাদের কষ্টটুকু আড়াল করে দায়িত্বের কথা বুঝাতে চেষ্টা করলেও তা আর কেউ বুঝে না।এদিকে পদে পদে জবাবদিহিতা, বসদের কড়া শাসনের ভয়, তার উপর আপনজনদের মান-অভিমান জীবনটাকে বিষিয়ে তুললেও সবকিছু তারা সহ্য করে যায় নীরবে নিভৃতে। তাদের এই সেক্রিফাইস একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর এই পেশার সদস্য ছাড়া কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব না। কেউ তা কোনোদিন অনুধাবন করার চেষ্টাও করেন না।

চাকরি সুবাদে রংপুরে প্রায় দেড় বছর ধরে অবস্থান করলেও এখন পর্যন্ত এই শহরের বাইরে কোথাও যাওয়া সম্ভব হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের সুবাধে আশেপাশে জেলার অনেকের সাথে ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলেও একটিবারের জন্যও তাদের সাথে দেখা করতে পারিনি। অনেকেই শুক্রবার বা শনিবার ছুটির দিনের কথা বলে ইনভাইট করেন। হয়তো বলেও বুঝাতে পারি না যে, পুলিশের শুক্রবার কিংবা শনিবার বা ছুটির দিনেও ছুটি নেই। সব দিনই সমান।

রংপুরের পাশের জেলার এক ফেসবুক বন্ধু তার বাসায় বেশ আগে থেকেই ইনভাইট করছেন। আজও ফোন করে যথারীতি যেতে বললেন। আমি বললাম, ভাই ডিউটি চলছে। উনি জানতে চাইলেন, ডিউটি শেষ হবে কখন? আমি বললাম, ৩টায়! এ কথা শুনার পর উনি বললেন, ডিউটি শেষ করেই তাহলে চলে আসেন। আমি তাকে শত চেষ্টা করেও বুঝাতে পারিনি যে, পুলিশের চাকরিতে ডিউটি শেষ মানেই সে যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারবে, এমন কোনো সুযোগ নেই। যে কোনো সময় তাকে ডাকতে পারে। এমনকি তার প্রিয় মানুষটির সাথে একান্ত মুহূর্তের সময়ও।

আমার সেই বন্ধুটি অবশ্য মনে মনে কিছুটা অভিমান করেছে। আমাকে এটাও বলেছে, তার কয়েকজন পুলিশ ফ্রেন্ড আছে তারা তো কোনোদিন এরকম কোনো নিয়মের কথা কোনোদিন বলেননি। আমি হয়তো না যাওয়ার জন্য কথাগুলো বলছি। বিশ্বাস করুন, আমি না যাওয়ার জন্য মোটেই কথাগুলো বলিনি। যা বাস্তব তাই বলেছি। এবং এটাই নিয়ম। পুলিশ আইনের ২২ ধারা তাই বলে।

male policeআর এই নিয়মটা একজন মানুষকে কতটুকু মানসিক পেইনে রাখে একবার ভেবে দেখেছেন? পুলিশের চাকরিতে একজন পুলিশ সদস্যের জন্য সব সময় যেন এক জরুরি অবস্থা। আর এই জরুরি অবস্থা মোকাবেলা করতে গিয়ে এক একজন পুলিশ সদস্যকে তিলে তিলে তার জীবনের সাধ-আহ্লাদ, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, সামাজিকতা, বিনোদন, সমস্ত কিছুই সেক্রিফাইস করতে হচ্ছে দিনের পর দিন।তারপরও তারা হাসিমুখে আপনাদের সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। চেষ্টা করছে ব্রিটিশ ধ্যান ধারণা থেকে পুলিশকে বের করে জনগণকে একটি জনবান্ধব পুলিশিং উপহার দিতে। দূরে নয় আপনার বন্ধু পুলিশের পাশে থাকুন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু, সুন্দর এবং স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করুন। তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন। গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি ভালো কাজের প্রশংসা করে তাদের উৎসাহ দিন।

লেখক : সালেহ ইমরান
এসআই, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), রংপুর।

Inline
Inline