পুত্র হত্যার বিচার দাবী করলেন না পিতা

babaএকই দিনে দুজন প্রকাশক, ব্লগার ও লেখকসহ চারজনের ওপর হামলার ঘটনাটি বাংলাদেশে নজিরবিহীন। এ ঘটনায় দেশবাসী ভীষণভাবে মর্মাহত, স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। হামলা যে পূর্বপরিকল্পিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্লগারদের ওপর এর আগের হামলার সঙ্গে এ হামলার যথেষ্ট মিল রয়েছে। বিচারহীনতার কারণেই যে দুর্বৃত্তরা বারবার এ ধরনের হামলার সাহস পাচ্ছে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারের উচিত হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এদিন দুপুরে লালমাটিয়ায় আরেক প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলকে তার কার্যালয়ে ঢুকে কুপিয়ে আহত করে সন্ত্রাসীরা। এ সময় টুটুলের সঙ্গে থাকা ব্লগার তারেক রহিম ও রণদীপম বসুকেও কুপিয়ে আহত করা হয়।

অভিজিৎ রায়ের লেখা বিশ্বাসের ভাইরাস ও অবিশ্বাসের দর্শন নামে দুটি বই জাগৃতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও শূন্য থেকে মহাবিশ্ব নামে একই লেখকের দুটি বই প্রকাশ করে শুদ্ধস্বর। এ বইগুলো লেখার জন্য ইতিমধ্যেই লেখককে প্রাণ দিতে হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার প্রকাশকরা দুর্বৃত্ত কর্তৃক আক্রান্ত হলেন।

এর আগে ব্লগারদের হত্যা করতে যেভাবে হামলা করা হয়েছে, ঠিক একই কায়দায় এ দুটি হামলাও হয়েছে। আগের হামলাকারীদের যদি গ্রেফতার করে শাস্তি নিশ্চিত করা যেত, তাহলে এ ধরনের মর্মান্তিক, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেকটাই এড়ানো যেত। হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, কারা এর মদদদাতা, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে- সবকিছু সরকারকে উদ্‌ঘাটন করতে হবে।

ব্লগারদের লেখায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মতো যদি কোনো বিষয় থাকে তাহলে প্রচলিত আইনে শাস্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আইন হাতে তুলে নিয়ে মানুষ খুন করার মতো অপরাধ কোনো ধর্মই প্রশ্রয় দেয় না।

এর আগে রাজধানীর পুরান ঢাকায় হোসেনি দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় গ্রেনেড হামলায় দুজন নিহত হন। এ হামলার রহস্য এখনো উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তা ছাড়া, ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ও ৩ অক্টোবর রংপুরে দুজন বিদেশি খুন হন। এসব কারণে মানুষের মধ্যে দিন দিন নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

শনিবার সন্ধ্যায় এ হামলার দায় স্বীকার করে আনসার আল ইসলাম। বাংলাদেশে বারবার মুক্তচিন্তা বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ নিয়ে হয়েছে নানামুখী চক্রান্ত। চক্রান্তকারীরা এ জন্য হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি। শুধু তাই নয়, হত্যার পর বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে দায় স্বীকার করে বিবৃতিও দেওয়া হয়েছে। আমরা অতীতে লক্ষ করেছি, এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কিছুদিন তৎপর থাকে। দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতিও চোখে পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়। ঘটে আরেকটি নতুন ঘটনা। এই চক্র যেন আর শেষ হওয়ার নয়।

একটি কমিউনিটির ওপর বারবার হামলার বিষয়টি মানুষের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। হামলাকারীরা যাকে টার্গেট করছে, তাকেই হত্যা করছে। সুতরাং বিষয়টি আর ভুলে যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। একই দিন দুজন প্রকাশকের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের মানুষ আজ উদ্বিগ্ন। হামলাকারীরা গ্রেফতার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে এ নিয়ে হতাশাও আছে। যে কারণে হয়তো ফয়সল আরেফিন দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘আমি বিচার চাই না।’

একজন পিতা কখন পুত্র হত্যার বিচার চান না, ভেবে দেখতে হবে। এ ঘটনা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভাবতে হবে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর কেন এসেছিল? নইলে অবকাঠামোগত যত উন্নয়নই হোক, দেশের রিজার্ভ ব্যাংক যতই শক্তিশালী হোক, প্রকৃত উন্নয়ন কখনো ঘটবে না। স্বপ্নের সোনার বাংলা স্বপ্নেই রয়ে যাবে।

Leave a Reply