পলাশবাড়ীতে তামাকের আবাদ বেড়েছে ২০ গুণ, কমেছে কৃষিজমি

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, গাইবান্ধা সংবাদদাতা : সেই দুর্গম পলাশবাড়ী উপজেলার নদীর দুইতীরে বেশ কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ব্যাপক আকারে এবারও তামাক চাষ শুরু হয়েছে। সড়কপথের দুইপাশে পলাশবাড়ী উপজেলার চরাঞ্চালসহ নদীর পাড় বিলের পাড় উঁচু জমি ও সদরজুড়েই শুধু তামাক চাষ আর তামাক চাষের সূচনা নজরে পড়ছে আবারও।

উপজেলায় শীতকালীন শাকসবজীর আবাদ প্রতিবছরের মত এবারও ভয়ানকহারে কমে যায়। বর্তমানে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়ানগুলোতে সাধারণ তরকারীর দাম প্রতি কেজি গড়ে ৩০ থেকে ৬০ টাকা।

পলাশবাড়ী উপজেলায় সর্বনাশী তামাক চাষের ব্যাপক প্রস্তুুতি চলছে। আসন্ন মৌসুম উপলক্ষে চাষীরা তামাক কোম্পানীগুলোর অগ্রীম অর্থসহায়তায় অবাধে তামাক চাষের জন্য মাঠে নেমেছে। উপজেলার নানাস্থানে বিপুল সংখ্যক তামাক পাতার বিজতলা স্থাপিত এবং চারা উত্তোলন করা হয়েছে। বহু এলাকায় ইতিমধ্যেই জমিতে চাষীরা তামাক চারা লাগিয়েছে।

গত ১০ বছরে উপজেলায় তামাক চাষের ক্ষেত্র প্রায় ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, একই কারণে কমেছে কৃষিপণ্যের আবাদ। তবু প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্টদের কোন মাথা ব্যথা নেই তামক চাষ প্রতিরোধে।

ভোক্তা ও কৃষকদের অভিযোগ, তামাকচাষ বিরোধী জোরালো কোন ভূমিকাও পালন করছেন না সরকারি কর্মকর্তারা।

বেশকটি এলাকা পরিদর্শন এবং কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অবাধে তামাক চাষের ফলে এলাকা ভিত্তিক কৃষি জমি কমছে, বাড়ছে তামাক পাতা চাষের জমি। ফলে পুরো এলাকায় তরকারীর ও সাকসবজির আবাদ কমেছে। এতে হাটবাজারগুলোতে তরকারী ও সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় এলাকাবাসীকে তিনগুণ দামে সাকসবজি কিনে খেতে হচ্ছে। পুষ্টিবান সবজিরও কৃত্রিম সংকট বিরাজ করছে।

জেলা সদরে বর্তমানে ৩০ থেকে ৬০ টাকা দামে প্রতি কেজি তরকারি কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। একইভাবে উপজেলা গুলোতেও সবজির চরম সংকট বিরাজ করছে। তবুও নেই তামাক পাতার চাষ রোধে কোন পদক্ষেপ। তামাকচাষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রতিরোধ করা হচ্ছে না।

পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের কৃষিবিদ আজিজুল ইসলাম জানান, এ এলাকার সমতলের মাটি খুবই উর্বর এবং কৃষিপণ্য উৎপাদন উপযোগী। সর্বনাশা তামাকের বিকল্প চাষ হিসেবে আবাদ করতে আমাদের রাজস্ব খাত থেকে এবছরে ২১০০ জন কৃষককে ১ ভিগা করে ভুট্টা বিজ, আমন ধান বিজ, বুরো ধান বিজ ও আউষ ধানের বিজ, ভিটি বেগুন বিজ প্রদান করা হয় ও সাতে বিনা মূল্যে বিভিন্ন সারও প্রদান করা হচ্ছে। শুধুমাত্র তামাক চাষ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আগামীতে আরো ৬০০ জন কৃষককে ঠিক এভাবে সরকারি রাজস্ব খাত হতে সহায়তা দেওয়া হবে।
এভাবে, তুলা, আখ, আদা-হলুদ, মসলাজাতীয়সহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য আবাদ করা অতিব প্রয়োজন। এতে পরিবেশ অনুকুলে থাকবে, মানুষের পুষ্টির যোগানও বজায় রাখা সম্ভব হবে।

জেলার মৃত্তিকা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, অবাধে তামাকচাষের ফলে মাটি ক্রমশ উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। কৃষকদের এখনই সময় সেই সর্বনাশা তামাক চাষ থেকে ফিরে আসা। তামাক চাষের ফলে জমিতে কেঁচোসহ পরিবেশ রক্ষাকারী পোকা-মাকড়ও ধংস হয়ে যাচ্ছে। সরকারের কৃষি বিভাগসহ উন্নয়ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তামাকের বিকল্প চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

জেলায় তামাকচাষে নিয়োজিত তামাক কোম্পানীগুলোর স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেন, এলাকার চাষীরা নগদ অর্থ পাওয়ায় তামাকচাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কোন চাষীকে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তামাকচাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে না বলেও তারা দাবি করেন।

তারা বলেন, দেশে তামাকচাষ বন্ধ হলে বিদেশ থেকে বছরে কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকার তামাক আমদানী করতে হবে। তাছাড়াও তামাক উৎপাদন ও বিক্রিতকারণে সরকার বতর্মানে প্রতিবছর কমপক্ষে ৮ হাজার কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব পাচ্ছে বলে তারা জানান।