নানা অনিয়মে বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত

আতঙ্ক বিরাজ করছে ব্যাংকিং খাতে। যেকোনো সময় চাকরি হারানো কিংবা ‘মালিকানা’ বদলের ভীতি গ্রাস করেছে ব্যাংকিং খাতের কর্মীসহ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাঝে। এদিকে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও আর্থিক টালমাটাল অবস্থা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ফেলছে শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদেরকেও। এ অবস্থায় বলা যায় এক ধরনের স্থবিরতার দিকে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ এই খাতটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতিসহ ঋণ প্রদানে অনিয়ম গোটা ব্যাংকিং খাতকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এরমধ্যে যোগ হয়েছে পরিচালনা পর্ষদ বদলের সংস্কৃতি। ২০১৭ সাল জুড়ে ব্যাংকিং খাতে ‘মালিকানা’ বদলের ভীতি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেও আতঙ্কিত করেছে। ব্যাংকাররা শঙ্কায় আছেন কখন কোন্ ব্যাংক কার দখলে চলে যায় কিংবা কে কখন নিজের পদটি হারান। ব্যাংকিং খাতের সার্বিক এ অবস্থায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সংস্কারের উদ্যমের অভাব ছিল।

সাম্প্রতিককালে ব্যাংকিং খাতে নাজুক অবস্থার কারণ হিসাবে অনেকেই পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করেছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় কখনো অযোগ্যরাও পরিচালনা পর্ষদে স্থান পেয়ে গেছেন। কেউ এ ধরনের সুযোগ ব্যবহার করে লুটে নিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ। হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি এখনো ব্যাংকিং খাতে আলোচনার বিষয়। এসব ঘটনার কোনো প্রতিকার না হওয়ায় অনিয়ম চলছেই।

যদিও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: বাংলাদেশে অতীত ইতিহাস থেকে দেখা যায়, ব্যাংক ঋণ লুটপাটের ঘটনা নতুন ছিল না। পরবর্তীতে তা বেড়েছে এবং এর ধরনও পাল্টেছে। তথাপি ব্যাংকগুলো ব্যবসায় ভালো করে শিল্পের ঋণ যোগানে ভূমিকা রেখে আসছিল। শেয়ার বাজারেও ব্যাংকের শেয়ারের কারণে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা মুনাফা ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু পর্যায়ক্রমে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি এতটাই দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে যে, অনেক ব্যাংকই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক এর বড় প্রমাণ। পরিচালনা দুর্বলতার কারণে এসব ব্যাংক গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পারছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর একটি বাদে বাকিগুলোর মূলধন ঘাটতিও চরমে। কিন্তু ওসব ব্যাংকও ঋণ প্রদানে যথাযথ নিয়ম না মানার অভিযোগ রয়েছে। যা গোটা ব্যাংকিং খাতকেই ভঙ্গুরতার পথে নিয়ে যাচ্ছে। অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় বেশি হারে ঋণ বিতরণ করা হলেও সেই হারে আমানত বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য কমে যাচ্ছে।

এদিকে, ব্যাংক খাতের এই অবস্থার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের আকস্মিক বদলির ঘটনা বড় অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতিবিদরা যাকে আখ্যা দিয়েছেন কেলেঙ্কারি হিসেবে। তাদের মতে, ২০১৭ সালকে ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর হিসেবেই মানুষ মনে রাখবে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে এক সভায় ব্যাংকাররাও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। নতুন বছরে অনুষ্ঠিত এ সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বলেছেন, আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে শীর্ষ নির্বাহীদের চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। তারা অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতা দাবি করেন। গতবছর ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন তারা। এরফলে, ম্যানেজমেন্ট ও আমানতকারীরা ভীত হয়ে পড়েছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যদি ভীতির মধ্যে থাকে, তাহলে ব্যাংকের সার্বিক উন্নতি ঘটবে না। তিনি বলেন, তদারকি দুর্বলতাই ব্যাংককে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্যাংকিং খাতের এই অবস্থা সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে কলুষিত করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।