দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ সাজা কত হবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেড় বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর সর্বোচ্চ সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড রেখে নীতিগত অনুমোদন দেয়া সড়ক পরিবহন আইন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উঠছে মন্ত্রিসভায়।

২০১৭ সালের ২৭ মার্চ নীতিগত অনুমোদন দেয়া এই আইনে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হলে চালকের সর্বোচ্চ সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের কথা বলা ছিল।

অবশ্য গাড়ি দিয়ে কাউকে হত্যা করা হলে দণ্ডবিধিতে তার মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির কথা বলা থাকলেও এটি স্পষ্ট নয়। কারণ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কোনটি হত্যা হবে, সেটি পরিস্কার করে বলা হয়নি।

এর মধ্যে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে বেপরোয়া চালকের ফাঁসির সাজার দাবিতে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন হয়েছে আর সরকার তাদের দাবি মেনে নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছে।

তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এই দাবি মানবে কি না, সেটা স্পষ্ট নয়। কারণ, তাদের অবস্থান হচ্ছে, দুর্ঘটনায় যদি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেয়া হয়, তাহলে এই ঝুঁকি নিয়ে চালকরা কেন গাড়ি চালাবে।

আবার ছাত্র আন্দোলনে যেমন চাপ তৈরি হয়েছে, তেমনি পরিবহন শ্রমিকরাও যথেষ্ট চাপ দিতে সক্ষম। তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকলে পুরো দেশেই স্থবিরতা নেমে আসে, সেটি গত শুক্রবার থেকে বাস চলাচল বন্ধেই স্পষ্ট। এখন চালকের ফাঁসির দণ্ড হলে অন্যান্য গাড়ির চালকরাও কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তা ছাড়া বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র-এআরআইএর গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনার কারণগুলো চালক সর্বস্ব নয়। এই সেন্টারের সাবেক পরিচালক শামসুল হক এমনও বলেছেন, দুর্ঘটনায় চালক সর্বস্ব চিন্তা একটি অসুস্থ ভাবনা।

এই সেন্টারের মতো সড়কের মান, সড়ক কত চওড়া, সড়ক বিভাজক থাকা না থাকা, পথচারী পারাপারে নিরাপদ ব্যবস্থাসহ নানা বিষয় জড়িত এতে।

বুয়েটের গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই পথচারী যারা রাস্তা পার হতে গিয়ে নিহত হয়েছে। কাজেই দুর্ঘটনার হার কমাতে হলে পদক্ষেপ নিতে হবে সমন্বিত।

এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের নয় দফা মেনে নেয়ার বিষয়ে ঘোষণা দেয়া হয়েছে বারবার। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন, আইনে সর্বোচ্চ সাজাই থাকছে। তবে খসড়াটি শেষ পর্যন্ত কেমন দাঁড়িয়েছে, সে নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কিছু বলছেন না।

মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, খসড়া আইনটি ভেটিং বা পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। আইনমন্ত্রী গত বুধবারই সই করে অনুমোদন দিয়েছেন।

আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কমকতা ড. রেজাউল করিম জানান, নথিটি এখনই সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এই নথিটি আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠার কথা আছে। আর সংসদের আগামী অধিবেশনেই সেটি পাস হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

খসড়ায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে সাজা বাড়ানো হবে কি না, বা হলে কত হবে, সেটি এখনই বলছেন না কেউ। মন্ত্রিসভার বৈঠকের জন্য অপেক্ষায় থাকতে বলেছেন একাধিক মন্ত্রী।

যা ছিল নীতিগতভাব পাস হওয়া খসড়ায়

বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে কাউকে নিহত বা আহত করলেও দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাজা হবে। দুই গাড়ি পাল্লা দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।

দুর্ঘটনায় না পড়লেও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর জন্য আইনে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয় খসড়ায়।

খসড়া আইনের ৯৭ ধারায় দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে বলা হয়েছে, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলে বা গুরুতর কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ আহত হলে এ সংক্রান্ত অপরাধ দণ্ডবিধির ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, সড়ক বা মহাসড়কে গতিসীমার অতিরিক্ত গতি বা বেপরোয়াভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার কারণে কোনো দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বা সম্পত্তির ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট চালক, কন্ডাক্টর বা সহায়তাকারী ব্যক্তি এ আইনের অধীন অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হবেন এবং সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডিত হবেন।

দুর্ঘটনায় ৯৭ ধারায় সরাসরি সাজার বিধান না থাকলেও ৯১ ধারায় ৩ বছরের কারাদণ্ড অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।

৯১ ধারায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার ফলে কোনো দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট চালক, কন্ডাক্টর বা সহায়তাকারীর বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য হবে।

এ অপরাধের জন্য অনধিক ৩ বছর জেল, ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ২ পয়েন্ট কাটা হবে। তবে একই আইনের ৯৩ ধারায় দণ্ড ভোগকারী একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে সর্বোচ্চ দণ্ডের দ্বিগুণ দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।

বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে মামলা হয় ৩০৪(খ) ধারায়। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড। মালিক ও শ্রমিকদের চাপে আইনেও এ বিষয়টিই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আগের আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো শর্ত ছিল না। নতুন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য চালককে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। চালকের সহকারীরও পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া থাকতে হবে। সহকারী হতে হলেও বাধ্যতামূলকভাবে লাইসেন্স নিতে হবে। আগের অধ্যাদেশে সহকারীদের লাইসেন্সের কথা থাকলেও তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত ছিল না।
গাড়ি চালনার জন্য চালকের বয়স আগের মতই কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। আর পেশাদার চালকদের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ২১ বছর। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড দেওয়া হবে। আগের আইনে এই ধরনের অপরাধের জন্য তিন মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল।

চালকের সহকারীর লাইসেন্স না থাকলে এক মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে নতুন আইনের খসড়ায়।

গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে- এমন অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় চালকদের গ্রেপ্তার করতে পারবে।

তিন বছর আগেই উদ্যোগ

সড়ক পরিবহন আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ কয়েক বছর আগেই নেয়া হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এ আইনের খসড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে মতামতের জন্য দেয়া হয়।

এরপর কয়েক দফায় মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন অপরাধের সাজা কমানো হয়। তারপর তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর পুনরায় সংশোধনসহ আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়।