তাহলে হাইকোর্ট উঠিয়ে দেন: প্রধান বিচারপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃংখলা ও আচরণ বিধিমালা বিষয়ে আইনমন্ত্রণালয় যে খসড়া দিয়েছে তা সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশের উল্টো বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এই বিধিমালায় বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘তাহলে হাইকোর্ট কেন রাখবেন, হাইকোর্ট উঠিয়ে দেন।রবিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ রবিবার এ আদেশ দেয়।খসড়া গ্রহণ না করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে আপিল বিভাগ। আজ বেলা দুইটা থেকে আগামী বৃহস্পতিবার রাত ১২টার মধ্যে যেকোনো সময় এ আলোচনায় বসার জন্য বলেন প্রধান বিচারপতি। এতে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা, আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ওই বৈঠক করার কথা বলেছেন আপিল বিভাগ।নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃংখলা ও আচরণ বিধিমালা নিয়ে সরকারের সঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের টানাপড়েন চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই্ সর্বোচ্চ আদালত বারবার সময় বেঁধে দিলেও রাষ্ট্রপক্ষ সময় চেয়ে আবেদন করেছে বহুবার। পরে সবশেষ বারের মত সময় বেঁধে দেয়ার পর গত ২৭ জুলাই বিকেলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খসড়াটি হস্তান্তর করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।সেদিন এ নিয়ে শুনানি না হলেও দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি শেষে রবিবার সকালে এই সুপারিশের ওপর শুনানি হয়। এ সময় প্রধান বিচারপতি স্পষ্টতই তার অসন্তোষ জানান। বলেন, ‘আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হলো। উনি খসড়া দিয়ে গেলেন। আমি তো খুশি হয়ে গেলাম। যদিও খুলে দেখিনি। কিন্তু এটা কী। এখানে বলা হলো ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’। এটার মানে কী? সব আইনে ব্যাখ্যা থাকে। কিন্তু এখানে কোনো ব্যাখ্যা নেই।’এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুরে আলমকে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘খসড়ায় বলা হয়েছে- সরকার নির্ধারিত তারিখে বিধিমালার গেজেট কার্যকর হবে। অথচ মাসদার হোসেন মামলার রায়ে আদালত বলেছে, সুপ্রিম কোর্টে পরামর্শ মোতাবেক গেজেট হবে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? আমরা যেটা বলেছি তার উল্টোটা খসড়া করে পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ১৬ বছরে এটা হয়নি। আর সরকারের নির্ধারিত তারিখে গেজেট না হলে এটি ষোলশ বছরেও হবে না।প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এখানে বলা হলো, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হবে। তাহলে হাইকোর্টের তো কিছু থাকলো না। সব মন্ত্রণালয়ের। ১৮৬১ সালে কলকাতা হাইকোর্ট হয়েছে। তখন থেকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকরা নিম্ন আদালত পরিদর্শন করেন। এ ব্যবস্থা চলে আসছে। তাহলে হাইকোর্ট কেন রাখবেন। হাইকোর্ট উঠিয়ে দেন। মন্ত্রণালয় যা করেছে, তাতে এখন যদি কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির কোনো ক্ষমতা নেই।’‘আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম আইনমন্ত্রী এসেছে। খসড়া দিয়ে গেছেন। প্রেসে বক্তব্য দিয়েছেন হয়ে গেছে। কিন্তু কী রকম হলো’- আক্ষেপের সঙ্গে বলেন প্রধান বিচারপতি।এরপর সিনহা বলেস, ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসেন। রবিবার থেকে বৃহস্পতি দুপুর দুইটা থেকে আমি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিরা রাত ১২টা পর্যন্ত আপনাদের (সরকার) সময় দেবো।’‘বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিমালা নিয়ে আর রশি টানাটানি নয়। আইনমন্ত্রীসহ সরকারের যেকোনো এক্সপার্ট আসবেন, বৈঠকে বসব। অ্যাটর্নি জেনারেল আপনিও থাকবেন।’এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল না থাকার কথা বললে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি থাকবেন। আপনি সাক্ষী থাকবেন।’ এরপর আগামী ৬ আগস্ট পরবর্তী শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করেন।গত ২৩ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদন মঞ্জুর করে বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য আরও এক সপ্তাহ সময় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ নিয়ে আপিল বিভাগ ২২ বার সময় দিয়েছেন আদালত।
আদালত সূত্র জানায়, ১৯৯৯ সালের ০২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেনের মামলায় (বিচার বিভাগ পৃথককরণ) ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেওয়া হয়। ওই রায়ের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা ছিল। আপিল বিভাগের এ নির্দেশনার পর গত বছরের ৭ মে আইন মন্ত্রণালয় একটি খসড়া শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধি প্রস্তুত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়।গত বছরের ২৮ আগস্ট শুনানিকালে আপিল বিভাগ খসড়ার বিষয়ে বলেন, শৃঙ্খলা বিধিমালা সংক্রান্ত সরকারের খসড়াটি ছিল ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার হুবহু অনুরূপ। যা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী। এর পরই সুপ্রিম কোর্ট একটি খসড়া বিধিমালা করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান।