তলিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নের ফসল, হাওরজুড়ে কান্না

বিস্ত্রীর্ণ হাওরাঞ্চলে আর কয়েক দিন পরই সোনালি ফসল ঘরে তোলার কথা ছিল কৃষকদের। বছরজুড়ে তারা হাওরে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন তা বাস্তবায়নের আশায় বুকও বেঁধেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন বোধহয় হবে না। ইতোমধ্যে অনেকের স্বপ্ন চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে পানিতে; আবার অনেকের স্বপ্ন যেকোনো সময় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই নিয়ে হাওরজুড়ে এখন শুধুই হাহাকার আর কান্না। হাওরের লাখ লাখ কৃষক অতি শোকে এখন কাতর।
প্রবল বর্ষণ ও অকাল বন্যায় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার একর ইরি-বোরো জমির কাঁচা-পাকা ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। যা বাকি আছে তাও তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, গত কয়েক দিনের বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে জেলার হাওর উপজেলা অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইনে কয়েক হাজার একর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে অষ্ট্রগ্রামেই ২৫ হাজার একর জমির কাঁচাপাকা ধান তলিয়ে গেছে। হাওরাঞ্চলের কয়েকটি বাঁধ ভেঙে বোরো জমিতে পানি প্রবেশ করেছে। এতে হাজার হাজার কৃষক পড়েছে বিপাকে। বোরো জমি চোখের সামনেই পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার অষ্ট্রগ্রাম, মিঠামইন, ইটনা, করিমগঞ্জ ও নিকলীর হাওরে নয় হাজার ২৬৫ হেক্টর জমি সম্পুর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কৃষকরা জনিয়েছে।
পানির নিচ থেকে কৃষকেরা ডুবিয়ে ডুবিয়ে কাঁচা পাকা ধান কেটে আনছে। এই ক্ষতির ফলে অষ্টগ্রাম সদর, পূর্ব অষ্টগ্রাম, কলমা, আদমপুর, আব্দুল্লাপুর, খয়েরপুর আব্দুল্লাপুর, কাস্তল, বাংগালপাড় ইউনিয়ন, ইটনা উপজেলার বরিবাড়ি, রায়টুটি, এলেংজুড়ি, বাদলার ভান্ডার বাঁধ, খুনা তলার বাঁধ, থানেশ্বর, কুর্শির বাধ, ধনপুর ও মৃগা ইউনিয়নের ঝুঁকিপূর্ণ জিওলের বাঁধ, তেরাইল্লার বাঁধ, কাটইর দীনেশপুরের কাটাকালির বাঁধ, মৃগার বাধ, বাউন্দিগা, কলাবিল, নরবিল ও কালিপুরের বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এছাড়াও নিকলী, করিমগঞ্জ ও মিঠামইনের অনেক জমি তলিয়ে গেছে। এতে করে মাঝারি কৃষক, বর্গাচাষিই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার ক্ষতিগ্রস্ত হাওরাঞ্চল পরিদর্শনে আসেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. এম এ মুঈদ। তিনি অষ্ট্রগ্রামের হাওরের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সফিকুল ইসলামসহ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা।
হাওরে হেমন্তে একমাত্র ফসল বোরো উৎপাদন ছাড়া বর্ষাসহ ৭-৮ মাস বর্ষার পানিতে জলমগ্ন থাকে। তবু উৎপাদিত বোরো ধানের ২০ শতাংশ স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে ৮০ ভাগ উন্নতমানের ধান দেশের বিভিন্ন শহর বন্দর বাজারে বিক্রিসহ জাতীয় খাদ্যভাণ্ডারে যোগান হয়ে থাকে। হাওর অঞ্চলটি দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে নিচু এমনকি কোনো কোনো সমূদ্রের তলদেশ হতে নিচু রয়েছে। এই অঞ্চলে রয়েছে প্রচুর বিল বাদার ও হাওর। অগণিত সুইচগেইট কালভার্ট অপরিকল্পিত বাঁধের সমাহার, প্রকৃতির রৌদ্র রসে এই অঞ্চলে কোনো কোনো বছর রোপণের সময় অর্থ্যাৎ কার্তিক অগ্রহায়ণের মাসের পানির আটকে থাকার কারণে সময়মত কৃষকেরা রোপন করতে পারে না। আবার কোনো বছর চৈত্র বৈশাখ মাসেই অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বাঁধ ভেঙে প্রচুর ফসল বিনষ্টসহ জনজীবন বিপন্ন করে দেয়। গত মঙ্গলবার থেকে এ অঞ্চলে ক্রমাগত বর্ষণের এই অঞ্চলের মেঘনা, ধলেশ্বরী, বৈঠাখালী, করাতিয়া কলকলিয়া, ঘোরাউত্রা, বলাকা ইত্যাদি নদীতে ব্যাপক পানি বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বিল-মাকসা, ধোপাবিল, আন্দামান্দা, পদবিল, কৈরাইলের ইত্যাদি বিল বাদারগুলোর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে নদীর তীরবর্তী বিল বাদার ও চরায় ইরি বোরো ধানি ক্ষেতে শত শত একর কাঁচাপাকা ধান তলিয়ে মারাত্মক ক্ষতি সৃষ্টি করে।
এ ব্যাপারে আব্দুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়াম্যান আ, রশিদ, কলমার যুবলীগ নেতা ও কৃষক রামচরন দাস পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. কাছিদ মিয়া, বাংগালপাড়া বিশিষ্ট কৃষক বিদ্যুৎ রায় জানান, এই বর্ষণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই উপজেলার বিল-মাকসা, ধোবাবিল, বিল বল্লি, গাইযালা বেরি বিল ইত্যাদি বড় হাওর আব্দুল্লাপুরের হাওর, সমারচর কালীপুরের হাওর, চরপ্রতাব, কাওরাইল, ইকরদিয়ার চর ইত্যাদি বিল ও চর এবং মেঘনা, করাতিয়া কলকলিয়া, বৈঠাখালি ইত্যাদি এলাকায় প্রায় দশ হাজার কাঁচা-পাকা ধানের জমি তলিয়ে গেছে। অনেক জমিতে কৃষকেরা পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে কাঁচা-পাকা ধান কেটে আনছে বলেও জানান তারা।

Inline
Inline