ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের নাম পরিবর্তন করা উচিত

সমাদৃত ফুলার রোড, উপেক্ষিত বাঙালি বিজ্ঞানী, এবং আমাদের কলোনিয়াল হ্যাংওভার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে খুব সুন্দর একটি রাস্তার নাম ফুলার রোড। বুয়েটের পাশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বর থেকে শুরু হয়ে নীলক্ষেত পর্যন্ত যাওয়া এই রাস্তাটির পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের ছোট্ট ছিমছাম কলোনী। আরেকপাশে ঢাবির হল। আমি বুয়েটে পড়ার সময়ে এই রাস্তায় কতো বহুবার যে হেঁটেছি, হিসাব নেই। তখন অবশ্য জানতাম না এই ফুলার রোডের নাম এসেছে কোথা থেকে।


অত্যাচারী ফুলার
কয়দিন আগে বিজ্ঞানীদের জীবনী নিয়ে আমার (বিজ্ঞানীদের কাণ্ড কারখানা – Bigganider Kando Karkhana – ২য় খণ্ড) বই লিখতে গিয়ে হঠাৎ ফুলার সাহেবের নামটা চোখে পড়লো। কেন পড়লো, সেই কথায় পরে আসছি। কে এই ফুলার?
জোসেফ বাম্পফিল্ড ফুলার (Bampfylde Fuller) ছিলেন ব্রিটিশ অধীকৃত বাংলার পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের ছোট লাট অর্থাৎ লেফটেন্যান্ট গভর্নর। বঙ্গভঙ্গের পরে পরেই পাঠানো হয় তাকে বর্তমানের বাংলাদেশ এলাকার শাসক হিসাবে। চরম অত্যাচারী আর কূটকৌশলী ফুলার এসেই শুরু করেন ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি — পূর্ববঙ্গের মুসলিমদেরকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে হাতে রাখার পলিসি তাঁরই চালু করা। তখন চলছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে। খড়গহস্ত হলেন ফুলার। যেখানে প্রতিবাদ প্রতিরোধ পেলেন, লেলিয়ে দিলেন পেটোয়া পুলিশ বাহিনী। বিশেষ করে ছাত্রদের উপরে ছিলো ফুলারের চরম আক্রোশ। ঢাকায় নানা জায়গায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করাতে শুরু করলেন। কঠিন শাস্তি দিতে থাকলেন ছাত্রদের, তুচ্ছ সব অভিযোগের জন্য। বহিস্কার করা, জেলে দেয়া, অত্যাচার করা — সবই চলতে লাগলো। ফুলারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তখন ছড়িয়ে গেছে পুরো বাংলাদেশেই। সিরাজগঞ্জের দুইটি স্কুলে গিয়ে প্রতিবাদের শিকার হয়ে ফুলার দাবী করলেন ব্রিটিশ সরকারের কাছে, এই দুইটি সরকারী স্কুল পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। কত সাহস এর ছাত্রদের, ব্রিটিশ সরকার আর ফুলারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়!! এই চরম বাড়াবাড়ি ব্রিটিশ সরকারও মানলো না, ফলে ১৯০৬ সালে মাত্র ৯ মাসের মাথায় অত্যাচারী ছোট লাট ফুলার ইস্তফা দিয়ে বিদায় হলো বাংলা থেকে।
শেওড়াতলীর অসামান্য প্রতিভা
এবারে আসা যাক অন্য মানুষটির কথায়। ঢাকার শেওড়াতলীর হতদরিদ্র এক মুদীর দোকানদারের সন্তান। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো দারিদ্র্যের কারণে। ৫ মাইল হেঁটে প্রতিদিন স্কুলে যেতেন, জায়গীর থাকতেন অন্যদের বাড়িতে, কেবল শিক্ষার প্রতি আগ্রহের জন্য। বৃত্তি পরীক্ষায় সবাইকে অবাক করে পুরো বৃহত্তর ঢাকা জেলায় প্রথম স্থান পান, সেই টাকার ভরসায় বাড়ি ছেড়ে একাকী পড়তে যান ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। গল্পটা অন্যরকম হতে পারতো এর পরে। এই অসামান্য প্রতিভাবান মানুষটি পরবর্তীতে এনট্রান্স (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় পুরো পূর্ববঙ্গে ১ম ও পুরো বাংলা প্রদেশে ৩য় হবেন, ইন্টারমিডিয়েটেও তাই, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ও এমএসসিতে হবেন ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। এই প্রতিভাবান ঢাকাইয়া পদার্থবিদের নাম – মেঘনাদ সাহা।
কিন্তু ঢাকায় মেঘনাদের গল্পটা হয়ে গেলো অন্যরকম। কেনো? এই অত্যাচারী লাট সাহেব ফুলারের জন্য।
দরিদ্র মেঘনাদ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হলেন ১৯০৫ সালে। জুতা কেনার টাকা নাই, খালি পায়েই ক্লাসে যান। বাংলার ছোটলাট বাম্পফিল্ড ফুলার পরিদর্শনে আসবেন কলেজিয়েট স্কুলে। ছাত্ররা ঠিক করলো, ছোটলাট ফুলারের বিরুদ্ধে খালি পায়ে মিছিল আর স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানানো দরকার। ফুলার যখন কলেজিয়েট স্কুলের সামনে আসলেন, ছাত্রদের বিশাল মিছিল এসে বাঁধা দিলো তাকে। ব্রিটিশবিরোধী স্লোগানে ফেটে পড়লো চারিদিক। স্বাধীনতাকামী মেঘনাদ বয়সে অনেক ছোট হলেও এই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। দেশের জন্য টান বলে কথা। ফুলারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ করে ভাগিয়ে দিলো ছাত্রদের মিছিলকে। পরদিন স্কুলে যেতেই মেঘনাদের ডাক পড়লো। মিছিলে অংশ নেয়ার অপরাধে স্কুল থেকে পত্রপাঠ বহিষ্কার করে দেয়া হলো মেঘনাদকে। জেলে পাঠানো হয়নি তাই কপাল ভালো আর কি। কিন্তু বহিষ্কারের পাশাপাশি বৃত্তিটা বাতিল হয়ে গেলো।
চোখে অন্ধকার দেখলেন মেঘনাদ। জ্ঞানের প্রতি দুর্দম যে আকর্ষণ, সেই সাধনাটা কি বন্ধ হয়ে যাবে তাহলে? কী করবেন বুঝতে না পেরে ঘুরতে লাগলেন ঢাকার নানা স্কুলে। নর্থব্রুক রোডের কিশোরীলাল স্কুলের এক শিক্ষকের মায়া হলো। ভর্তি করে নিলেন মেঘনাদকে সেই স্কুলে। অতটা নামকরা নয় স্কুলটা। কিন্তু মেঘনাদ আবার ফিরে পেলেন তাঁর স্বপ্ন দেখার সুযোগ। বাকিটা ইতিহাস — এই শেওড়াতলীর মেঘনাদ এক সময়ে আবিষ্কার করবেন সাহা আয়নাইজেশন ইকুয়েশন, যার জন্য তাঁকে বলা হবে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের জনক হিসাবে। চার বার নোবেল পদার্থবিজ্ঞান পুরস্কারের জন্য মনোনীত হবেন তিনি।
এখন একটু থামি, আর ভাবি। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রের রাস্তাটা আমরা কার নামে রেখেছি? মাত্র ৯ মাস ঢাকায় থাকা ছাত্রবিরোধী অত্যাচারী ফুলারের নামে? বাংলাদেশ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর জন্য যাঁর অবদান শূন্য। যাঁর কারণে আমাদের দেশে জন্ম নেয়া সেরা পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন মেঘনাদ সাহার পড়ালেখা বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিলো। কেনো আমরা প্রতিদিন স্মরণ করবো এই অত্যাচারী ইংরেজ ছোট লাটকে এই রাস্তার নাম এর মধ্য দিয়ে? এ কি আমাদের নতজানু মানসিকতার নিদর্শন নয়? লজ্জ্বিত হয়ে গেলাম ব্যাপারটা জেনে — এরকম অত্যাচারী ইংরেজকে আমরা এতো সম্মান দিচ্ছি!
বাংলাদেশের ইতিহাসে যতজন বিশ্বমানের বিজ্ঞানী জন্ম নিয়েছেন, মেঘনাদ সাহা তাঁদের মধ্যে একেবারে সামনের কাতারে। সাহা আয়নাইজেশন ইকুয়েশনের স্রষ্টা এই বিজ্ঞানীটি বিশ্বজুড়ে আমাদের নাম উজ্জ্বল করেছেন। কিন্তু তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল তো দূরের কথা, তেমন কিছুরই নামকরণ করিনি, যদিও তিনি এই ঢাকারই সন্তান।
তাই আসুন, স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালি হিসাবে, এই অত্যাচারী ছোটলাটের নাম মুছে ফেলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য থেকে, আর তার বদলে স্মরণ করি আমাদের ঢাকার শেওড়াতলীর জন্ম নেয়া বিশ্বখ্যাত এই পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহাকে। পোয়েটিক জাস্টিস, সেটাই হয়।
ফুলার রোড আর নয়, আসুন রাস্তাটার নামটা পাল্টাই, অনেক দেরিতে হলেও …
(এই ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে আমার বিজ্ঞানীদের কাণ্ডকারখানা -২য় খণ্ড বইটিতে, যেখানে শেওড়াতলীর মেঘনাদের জীবনী নিয়ে অভিভূত হয়ে লিখেছি তাঁর সংগ্রামময় জীবনকাহিনী। বইমেলায় আদর্শ ৫৪৫-৫৪৭ ও অনলাইনে রকমারিতে বইটি আছে।)