জুতো – এস.তারিক বাপ্পি

এস.তারিক বাপ্পি – রাস্তায় বের হয়েই দোলার কপাল কুচকে গেলো।রোদের যা তেজ, তাতে হেটে এলিফ্যান্ট রোড পর্যন্ত যেতে যেতে মাথার ঘিলু টগবগ করে ফুটে অর্ধেকটা ছিটে যে রাস্তায় পড়বে, চোখ বন্ধ করে সে কথা বলে দেওয়া যায়। মহা মূল্যবান এই ঘিলু যেন কিছুতেই ছিটে রাস্তায় না পড়ে, এইজন্য দোলা একটা রিক্সা ডাকলো। রিকশাওয়ালা ডাকটা ভালমতোই শুনেছে, কিন্তু তার মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না। সে ঠিক আগের মতোই হ্যান্ডেলের উপর পা দিয়ে সিটের উপর টানটান করে শুয়ে রইলো। ভাবটা এমন যেন, এ জগতের কোনকিছুর সাথে তার কোন সম্পর্কই নেই!

দোলা এবার গলার স্বর গ্রীষ্মকালের বেলের শরবতের মতো মোলায়েম করে আবার ডাক দিলো, মামা…. যাবেন? এতো মোলায়েম স্বরে ডিপার্টমেন্টের প্লাস্টিক হৃদয়ের অধিকারী ফার্স্ট বয়কে ডাক দিলে সেও পরীক্ষার আগের রাতে তার টপ সিক্রেট নোট সীট নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে, অথচ এমন ডাকেও রিকসাওয়ালা নির্বিকার!

আশপাশে আর কোন রিকশাও নেই! যখন দরকার থাকেনা তখন একের পর এক রিকশা আসতেই থাকে। “আফা কই যাইবেন,আফা কই যাইবেন” বলতে বলতে বিরক্ত করে ফেলে! অথচ দরকারের সময় একটারও খোঁজ নেই!

দোলা এবার রিকসাওয়ালার আরো খানিকটা কাছে গিয়ে বললো, ভাই যাবেন? চোখ না মেলেই বললো, “না”। সে শুয়ে আছে ভিসি চত্বরের অপজিটে, মল চত্বরে একটা শতবর্ষী রেইনট্রি গাছের নিচে। দোলা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভিসি চত্বর হয়ে জহুরুল হক হলের কাছাকাছি আসতেই একটা রিকশা পেয়ে গেলো। দরদাম ঠিক করে উঠে পড়লো। গন্তব্য বাটা সিগনাল। একজোড়া জুতো কিনতে সে বেরিয়েছে। সে থাকে রোকেয়া হলে। পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে, দ্বিতীয় বর্ষে।

নীলক্ষেত, নিউমার্কেট হয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম রোড ধরে রিকশা যখন ইর্স্টার্ণ মল্লিকার সামনে আসলো, দোলার তখন মনে হলো একটা রিকশা মনে হয় অনেকক্ষণ ধরে তাকে অনুসরণ করছে। কৌতুহলের বসে সুযোগ বুঝে পিছনে তাকিয়ে সে কিছুটা চমকে উঠলো। কারণ, পিছনের রিকশায় বসা ছেলেটা তারই ক্লাসমেট শমসের। শমসের একটু মেয়ে ঘ্যাঁসা টাইপের হলেও দোলার সাথে তার এমন কোনো সম্পর্ক না, যার সূত্র ধরে সে তার পিছুপিছু আসবে।

দোলা আবার মনে মনে ভাবলো, ধুর কী সব ভাবছে সে! হয়তো তার এদিকে কোনো কাজ আছে, তাই আসছে। শুধু শুধু সে দোলার পিছনে পিছনে আসতে যাবে কেন? এই ভাবতে ভাবতে সে বাটা সিগনালে চলে এলো। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে সে রাস্তা পার হলো।

নয়নতারা পাদুকা বিতানে ঢুকে সবে মাত্র একটা জুতা পছন্দ করে পায়ে ঢুকিয়েছে সে, এমন সময় শমসেরও সেই দোকানের কাচের দরজা ঠেলে ঢুকলো। দোলা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গা বাচানো হাসি দিলো। দোকানের যে কর্মচারী জুতা দেখাচ্ছিল, সে বললো আপা,পছন্দ হইছে? দোলা বললো, না।উঠিয়ে রাখেন।
লোকটা বললো, অন্য একটা দেখাই? দোলা বললো, থাক। এখন নিবো না। এই বলে সে দ্রুত দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। লোকটা খানিকটা বিরক্তি নিয়ে দোলার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার পেছনে পেছনে শমসেরও বেরিয়ে এলো। দোলার বিরক্তির সীমা রইলো না।

গুমোট একটা বিরক্তি নিয়েই সে বললো, কিছু বলবেন? এবার সে মিনমিনে গলায় বললো, দোলা, “তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।” এই বলে সে কুচের মতো মোড়াতে লাগলো। দোলা বললো, কি কথা? এখানেই বলেন। সে বললো, বলছি একটু এইদিকে আসো প্লিজ! বাটা সিগনাল মোড়ের বটগাছটার গোড়ায় নিয়ে সে ইনিয়ে বিনিয়ে বললো, তোমাকে আমার খুব ভাললাগে। এই কথা শুনে দোলার পিত্তি জ্বলে গেলো!

সঙ্গত কারণে ডিপার্টমেন্টের সেরা তিনটা ছেলেমেয়ে যাদের দেখলেই দোলার গার মধ্যে কুটকুট করে, এই বস্তু তাদেরই একজন। সেই কিনা বলে তোমাকে আমার খুব ভাললাগে! দোলার ইচ্ছা করছে কশে পাছার উপর একটা লাত্থি মেরে নাকমুখ দিয়ে ভাললাগার ভুত বের করে দিতে,কিন্তু এই অবস্থায় তা সম্ভব হচ্ছে না!

মেজাজ খারাপ হওয়ার আরও একটা কারণ হচ্ছে ভাললাগার এই কথা বালার জন্য ক্যাম্পাসে কি জায়গার অভাব পড়ছে, যে এই পর্যন্ত এসে সিনক্রিয়েট করতে হবে! দোলা বললো, ভাইয়া দেখেন,আমি আপাতত এসব নিয়ে কিছু ভাবছিনা। আর আমি আশা করবো আপনি দ্বিতীয়বার এই নিয়ে আমার সাথে কোনো কথা বলতে আসবেন না। এই বলে সে দেরি না করে আবার দোকানের দিকে হাটা শুরু করলো।

একেতো দুপুরের ঠাঠা রোদ,বাতাস নেই তার উপর আবার ফুটপাতে মানুষ গিজগিজ করছে! গরমে, ঘামে দোলার বিরক্তি চরমে উঠলো। মাথা ঠান্ডা করার জন্য এক গ্লাস বেলের শরবত কিংবা একটা কড়া ঠান্ডা স্প্রাইট খেতে হবে। ফুটপাত ধরে সাইন্সল্যাবের দিকে আরেকটু হেটে গেলেই কয়েকটা দোকানে কোক-টোক বিক্রি হয়।

দোলা হাটতে হাটতে এমন একটা দোকানের সামনে এসে বললো ভাই,খুব টান্ডা স্প্রাইট হবে? দোকানদার বললো, “লিশ্চই লিশ্চই, হবে না মানে! অবিশ্যই হবে অবিশ্যই হবে।” দোলার হাসি পেয়ে গেলো। লোকটার সামনের দুটো দাঁত নেই, কথা বলার সময় সেখান থেকে বাতাস বের হয়ে যাচ্ছে! বেচারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে উপরের ঠোঁট দিয়ে দাঁতের ফাঁকা জায়গাটা পূরণ করতে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না, মাঝখান থেকে তার পুরো চেহারা জুড়ে অদ্ভুত একটা ব্যাপার হচ্ছে! তারচেয়ে মজার ব্যাপার, লোকটা প্রতিটা কথা দুবার করে বলছে!

দোকানের ভেতর ধপাস করে শব্দ হলো। দোলা তাকিয়ে দেখলো ফ্রিজ থেকে স্প্রাইট বের করতে যেয়ে লোকটা কোকের অনেকগুলো কাচের বোতল ফেলে ভেঙে ভেলেছে! লোকটার জন্য দোলার মায়া হলো। বেচারার একটা ক্ষতি হয়ে গেলো!

বেঞ্চে বসে কোক খেতে খেতে দোলা শুনলো, লোকটা কুৎসিত ভাষায় কোক কোম্পানির গুষ্ঠি উদ্ধার করে দিচ্ছে! তাদের অপরাধ, কাচের বোতলে কেন তারা কোক বিক্রি করে? আর বেচবি ভালো কথা, এতো পাতলা কেন বানাবি বোতল! পড়ে গেলেই ফট্টাস! এখন এই ভাঙ্গা বোতল নাকি কোক কোম্পানির মালিকের পশ্চাৎদেশ দিয়ে ঢুকিয়ে দিবে! দোলা স্প্রাইটের দামটা দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসলো। এখন তার মন ভালো হয়ে গেছে। দোকানদারের কথাবার্তা আর কার্যকলাপের কথা মনে করে খুব হাসি পাচ্ছে!

দোলা একজোড়া জুতো কিনলো। ফুটপাতে একলোক হাওয়াই মিঠা বিক্রি করছিলো দশ টাকা দরে, তার একটা কিনলো, সবশেষে একটা স্প্রাইট কিনে রিকশায় উঠে পড়লো।

শাহবাগ মোড়ের একটু আগে বিকট শব্দে রিকশার ডান পাশের টায়ারটা ফেটে গেলো! হাতের স্প্রাইটের বোতলটা একদিকে আর জুতোর ব্যাগটা আরেকদিকে ছিটকে পড়লো। ঘটনা তেমন কিছুই না, তারপরেও মুহূর্তের মধ্যে একগাদা অকর্মা লোকজন জমে গেলো! এদেশে সবকিছুর অভাব হলেও উৎসুক জনতার অভাব কোনদিনই হবেনা। পান থেকে চুন খসলেই মানুষ হাম্লি খেয়ে পড়ে। দেখা যাবে ঘটনা হয়তো কিছুই না,কিন্তু এমনভাবে তারা ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকবে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটিই এখানে এইমুহূর্তে ঘটছে! না দেখলে জীবনটাই যেন বৃথা!

দোলা জুতোজোড়া কুড়িয়ে নিয়ে ত্রিশ টাকা ভাড়ার সাথে অতিরিক্ত কুড়ি টাকা দিয়ে জাতীয় জাদুঘরের পাশের ফুটপাত ধরে হাটা শুরু করলো। চারুকলার সামনে আসলে কি মনে করে হলে না যেয়ে চারুকলায় ঢুকে পড়লো। ক্যাম্পাসে তার খুব পছন্দের কয়েকটা জায়গার একটা হচ্ছে এই চারুকলা। এখানকার আবহাওয়া সবসময় কবিতাবান্ধব। দোলা চারুকলার কাঠগোলাপ গাছের নিচে বসে অনেক কবিতা লিখেছে। এখনও সময় পেলে লেখে।

গেট দিয়ে ঢুকে সোজা গিয়ে সে পুকুরের পূর্ব পাড়ের ফাঁকা জায়গাটায় বসলো। কয়েকটা কাঁঠাল গাছ পাশাপাশি থাকায় এই জায়গাটা একটু জংগলের মতো। জুতোজোড়া সামনে রেখে খানিক্ষন সেদিকে তাকিয়ে থেকে তার চোখ ভিজে উঠলো। দীর্ঘদিন পর তার ছোটো বেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো।

তখন দোলা ক্লাস থ্রিতে পড়ে। তার বড়ো বোন মাহফুজা টেনে আর মেজবোন মুশফিকা পড়ে সিক্সে। বাবা তখন কাজ করেন বাগেরহাটের একটা মাছের খাবারের মিলে। তখন নুন আনতে পান্তা ফুরানোর চেয়েও অবস্থা খারাপ তাদের সংসারের ! বাবা, মা,দাদি আর তারা তিনবোন, মোট ছয়টা পেট চলে একজনের সামান্য একটা চাকরির পয়সায়! মাসের মাঝামাঝি সামান্য যে কয়টা টাকা বাবা পান, অভাবের দাউদাউ আগুনে তা নিমিষেই পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়! শেষ ভরসা মামা বাড়ি থেকে কিছু সাহায্য! নানি কিছু টাকাকড়ি, চাল,ডাল দিয়ে সাহায্য করেন মামিদের অগোচরে! মামিরা দেখতে পারলে লঙ্কা কান্ড বেধে যায়!

এরমধ্যে ঈদ চলে এলো। গত ঈদে বাবা কাউকেই কিছু কিনে দিতে পারেননি। এবার তিনি রোজার শুরুতেই বলেছেন তিন বোনকে নতুন কাপড় কিনে দিবেন বেতন পেলে। ঈদ ১৮ তারিখ। ১৫ তারিখে বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও, কোম্পানি তা দেয়নি, ১৬ তারিখেও না। শেষমেষ মালিকপক্ষ বলেছে ১৭ তারিখ দিবে। বাবা সকালে কোম্পানিতে যাওয়ার সময় বলে গেছেন, আসার সময় সবার নতুন কাপড় কিনে আনবেন।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেলেও বাবার আসার কোনো হদিস না পেয়ে অপেক্ষা করতে করতে একসময় তারা তিনবোন ঘুমিয়ে পড়লো। গভীর রাতে বাবা তাদেরকে জাগিয়ে সবাইকে একেকটা স্পঞ্জের স্যান্ডেল দিয়ে ছোটদের মতো করে কাঁদতে লাগলেন। একটু পরেই আসল ঘটনা জানা গেলো, আজও কোম্পানি বেতন দেয়নি। শেষমেষ বাবা একজনের কাছ থেকে একশো টাকা ধার করে তাদের তিনবোনের জন্য এই স্যান্ডেল কিনে এনেছেন, এইজন্য এতো দেরি!

দোলার মা নাদিয়া বেগম বাম হাতে শাড়ীর আঁচল মুখে গুজে ডান হাতটা স্বামীর কাঁধে রেখেছেন। দোলা তখন অনেক ছোটো, তাই কিছু বুঝতে পারছিলো না। জামা কাপড় কিনে আনেনি এইজন্য তারা কাঁদবে,বাবা কেন এভাবে কাঁদছে! শুধু দেখলো তার বড়বোন মাহফুজা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলছে , “বাজান তুমি কাইন্দো না। আমাগো আর কিচ্ছু লাগবে না। তুমিই আমাগো ঈদের নতুন জামা কাপড়। তুমি থাকতি আমাগো আর কিচ্ছু চাইনা।” দোলা বুঝতে পারেনি সেদিন যে একজন মানুষ আবার কিভাবে ঈদের নতুন জামা কাপড় হয়!

এখন সে বোঝে কিভাবে মমতার পাহাড় একজন হতদরিদ্র বাবা মেয়েদের ঈদের নতুন জামা কাপড় হয়। অভাবের কারণে ঈদে মেয়েদেরকে কাপড় কিনে দিতে না পেরে দরদর করে চোখের পানি ছেড়ে দিলে সেই পানি কিভাবে ছেলেমেয়েদের জন্য সবচেয়ে দামী উপহার হয়।

আজ দোলার ক্ষমতা আছে দামী একটা জুতা কিনে বাবাকে দেওয়ার, কিন্তু নেওয়ার জন্য শুধু সেই মানুষটা নেই! বাবারা পৃথিবীতে আসে শুধু সন্তানকে মনপ্রাণ উজাড় করে দেওয়ার জন্য, নেওয়ার জন্য এই মানুষগুলো কেন একটু অপেক্ষা করে না? তাঁদের কিসের এতো তাড়া? বাবারা কেন এতো স্বার্থপর হয়?

জুতো। 
এস.তারিক বাপ্পি।
১৪/০৩/১৯
শ্রাবণধারা ৩৭৫, জহুরুল হক হল, 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।