চেইন অব কমান্ড সশস্ত্র বাহিনীতে লক্ষ্য অর্জনে মুখ্য ভূমিকা রাখে : প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা, ৫ জুলাই, ২০১৮ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সশস্ত্র বাহিনীর সর্বস্তরে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, কার্যকরী কমান্ড চ্যানেল সশস্ত্র বাহিনীতে লক্ষ্য অর্জনে মুখ্য ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সকল স্তরের কমান্ডারদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও তাদের প্রতি অনুগত থাকলে যে কোন কাজ দক্ষতা, শৃংখলা ও নৈপুণ্যের সাথে সম্পন্ন করা সম্ভব।’
শেখ হাসিনা আজ ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) ৪৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।
সেনা সদস্যদের শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্রবাহিনীকে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে এই বাহিনীর সদস্যদের চেইন অব কমান্ড সবসময় মেনে চলতে হবে।
তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তাদের অধীনস্থদের সুযোগ-সুবিধা দেখতে হবে। আবার অধীনস্থ যারা তারাও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে শৃঙ্খলা বজায় রেখে কাজ করবে সেটাই আমি আশা করি।’
‘কারণ, এটা যেহেতু সুশৃঙ্খল বাহিনী, কাজেই এর কমান্ড ঠিক থাকতে হবে এবং সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে চলতে হবে, তাহলেই যেন কোন লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পারবো’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করেছি ২০২০ সালের জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আমরা পালন করবো, এই সময়ের মধ্যেই আমরা দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে গড়ে তুলতে চাই।
তিনি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণকে ধরে রাখার আহবান জানিয়ে বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। সেই পরিকল্পনা নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
তাঁর শাসনামলে দেশের সকল প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিটা প্রতিষ্ঠানই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই উন্নয়নে অবদান রেখে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে পিজিআর কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর হারুন স্বাগত বক্তৃতা করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী পিজিআর সদর দপ্তরে পৌঁছলে রেজিমেন্টের কোয়ার্টার গার্ড-এ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পিজিআর কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর হারুন তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সকল অফিসার, জুনিয়র কমিশনন্ড অফিসারদের সঙ্গে এবং কুশলাদি বিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে একটি সুসজ্জিত গার্ড রেজিমেন্ট প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে রেজিমেন্টে কর্মরত অবস্থায় নিহত, শহীদদের স্বজনদের উপহার সামগ্রী বিতরণ করেন এবং অনুদান হস্তান্তর করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান, প্রতিরক্ষা সচিব আখতার হোসেন ভূইয়া, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মো. জয়নুল আবেদীন, বীর বিক্রম ও প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দেশের উন্নয়নের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমরা দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেছি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তোরণ ঘটেছে।
তাঁর সরকার পৃথিবীতে ৫৭তম দেশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মহাকাশকেও জয় করেছি। অর্থাৎ মহাকাশেও বাংলাদেশের পতাকা পৌঁছে গেছে।’
দেশের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবকিছুই পর্যায়ক্রমে আমরা করে যাচ্ছি, বলেন তিনি।
জাতির পিতা ১৯৭৪ সালের ১৪ জুলাই বেতবুনিয়াতে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করেই এর বীজ বপন করে যান বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই একটা সিদ্ধান্তের পর বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পরিবর্তিত হয়ে একে একটি সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে গেছে। আজকে পদ্মাসেতু দৃশ্যমান’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা এ সময় ’৯৬ পরবর্তীতে সরকারে আসার পর পার্বত্য শান্তিচুক্তি করে ৬৪ হাজার শরণার্থীকে ভারত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা, ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়। পাশাপাশি স্থল সীমানা চুক্তির আওতায় ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ছিটমহল বিনিময়, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্র সীমান্ত সমস্যার সমাধানসহ ২০০৮ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন কূটনৈতিক সাফল্য তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় পিজিআর সদস্যদের কল্যাণে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আমাদের সরকার সর্বপ্রথম ১৯৯৮ সালে গার্ডস সদস্যদের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে গার্ডস ভাতার প্রচলন করে। আপনাদের আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই রেজিমেন্টের সাংগঠনিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন করে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকরী ও শক্তিশালীরূপে পুনর্গঠিত করা হয়।
২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে স্বতন্ত্র ফরমেশন হিসাবে ঘোষণা করা হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে গণভবন সংলগ্ন ব্যারাক নির্মাণ করে আবাসন সমস্যার অনেকটাই সমাধান করা হয়েছে। এছাড়াও সেনানিবাসে গার্ডস পরিবারের জন্য ১৪-তলা বিশিষ্ট পারিবারিক বাসস্থানের নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করি, এই ভবনটির নির্মাণ কাজ অল্প দিনেই সমাপ্ত হবে।
সার্বিক জাতীয় উন্নয়নের পাশাপাশি তাঁর সরকার সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নেও কাজ করে যাচ্ছে এবং সশস্ত্র বাহিনীর যত উন্নয়ন তা তাঁর সরকারের সময়েই হয়েছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী মানবিককারণে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় গ্রহণের বিষয়টিও স্মরণ করেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর তিনি এবং তাঁ ছোট বোন শেখ রেহানার রিফ্যুজি হিসেবে দেশের বাইরে দিন কাটানোরও উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ সংশ্লিষ্টদের দিনরাতের পরিশ্রম বিদেশে দেশের ভাবমূর্তিকে আরো উজ্জ্বল করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে যদি বাংলাদেশের জনগণ ভোট দেয়, আল্লাহর ইচ্ছা থাকেতো আমরা সরকার গঠন করবো। আর যদি না হয়, তাহলেতো আর সরকার গঠন করবো না। তবে, চিরদিন আপনাদের কথা মনে থাকবে যে, আপনারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরাপত্তার জন্য দিনরাত রোদ, বৃষ্টি, ঝড়কে উপেক্ষা করে যে দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছেন। কারণ, আমার জীবনের সঙ্গেই ঝুঁকি জড়িয়ে আছে। সেটা আমার সবসময় মনে থাকবে এবং সব সময় আপনাদের জন্য আমি দোয়া করি।