চুয়াডাঙ্গায় চলতি বছরে শত কোটি টাকার কীটনাশক বিক্রি

হাবিবুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: চুয়াডাঙ্গা জেলায় বছরে শত কোটিরও বেশি টাকার কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে শিম, বেগুনসহ বিভিন্ন খাটো আবাদে। চলতি বছরে চুয়াডাঙ্গায় একটি কোম্পানির প্রায় ৪২ কোটি টাকার কীটনাশক বিক্রি হয়েছে। কীটপতঙ্গ থেকে শাক শবজি রক্ষার্থে কীটনাশক প্রয়োগের মাত্রা যেমন বাড়ছে, তেমনই কীটনাশকযুক্ত সবজি খেয়ে কিডনিসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। কীটনাশক প্রয়োগের ন্যূনতম তিনদিন পর ওই শাক বা সবজি তোলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু কীটনাশক ব্যবহারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিম, বেগুন, ঢেঁড়স বা শাকপাতা তুলে রান্না করে খেলে কতটা ক্ষতি তা বুঝে না বুঝেই হাটে বাজারে বিক্রি হচ্ছে । কীটনাশক প্রয়োগের ৩দিন পর শাক বা সবজি তোলা হলেও তাতেও শূন্য দশমিক পাঁচ পরিমাণের কীটনাশক থাকে। এটা মানবদেহের জন্য কিছুটা সহনীয় হলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা খেলে অনেকটা বিষ খাওয়ার মতোই হয়। খাটো আবাদ করা কৃষকদের অনেকেই পোকামুক্ত সবজি বাজারে ভালো দামে বিক্রির জন্য কীটনাশক প্রয়োগের মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই তা তুলে বাজারে বিক্রি করে থাকেন। ভোক্তাদের অনেকেই ওইসব কীটনাশকযুক্ত শাকসবজি রান্না করে খেয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন নানা ধরনের রোগে।
খাটো আবাদ করা অনেক কৃষক ভোরে কীটনাশক দিয়ে দুপুরে বেগুন তুলে হাটে নেয়ার ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটে। ফলে হাটে বাজারে কীটনাশকমুক্ত সবজি পাওয়া ভার। কৃষকের সাথে, কৃষি সম্প্রসারণের উপ-কৃষি কর্মকর্তাদের মাঝে মধ্যে গণসচেতনা মুলক বৈঠক করে ভোক্তাদের সচেতন করা উচিত। সেই সাথে বিষমুক্ত সবজি আবাদের জন্য যেমন মাঠ দিবস করা হয় তেমনি সবজি বাজার জাত করনের কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া যাতে কৃষকরা বিষযুক্ত সবজি বাজার জাত না করে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৭ হাজার ৭শ’ ৫৫ হেক্টর জমিতে খাটো আবাদ হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে শিম, বেগুন, ঢেঁড়স, টমেটো, ধনেপাতা, পেঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি। এসব খাটো আবাদের অধিকাংশই কীট পতঙ্গ থেকে রক্ষা করতে কীটনাশক প্রয়োগ করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের।
কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মাঠে পাখ-পাখালিই শুধু হ্রাস পাচ্ছে না, মানুষেরও অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলায় মোট ১২০টির মতো কীটনাশক কোম্পানির কীটনাশক বিক্রয় প্রতিনিধি নিযুক্ত রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য ডিলার। বিক্রয় প্রতিনিধিরা দোকানিদের কোন আবাদে কোন কীটনাশক দিতে হবে তার কিছুটা ধারণা দেন। কৃষকদের অধিকাংশই ওই বিক্রেতাদের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। বিক্রেতারা সাধারনত ক্ষেতে সকাল-বিকেল কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরের মাখালডাঙ্গার রূপা আলী বলেছেন, মাঠে এক বিঘা জমিতে বেগুনের ক্ষেত রয়েছে। প্রতিদিন সকালে বেগুনে বিষ বা কীটনাশক দিতে হয়। শীতে একদিন পরপর দিলেও চলে। কিন্তু গরমের সময় সকাল বিকেল না দিলে বেগুন তো পোকার হাত থেকে বাঁচানোই যায় না।
কীটনাশক প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সবজি তুলে যতোবার ধুয়েই হোক, আর যতো তাপেই রান্না করা হোক না কেন, তাতে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর বিষের মাত্রা থেকেই যায় ফলে বড় ক্ষতি হয়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মেডিসিন ও কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. নূরুল ইসলাম চৌধুরী এ মন্তব্য করে বলেছেন, মাত্রা অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের কারণে কীটনাশক জনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এদিকে বিষ কোম্পানি সিনজেন্টা’র চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত মার্কেটিং কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেছেন, চলতি বছরে আমাদের কোম্পানির প্রায় ৪২ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকারের কীটনাশক চুয়াডাঙ্গা জেলায় বিক্রি হয়েছে। অটো এগ্রোফেয়ারের চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি আব্দুর রব মিয়া বলেছেন, চলতি বছরে বিক্রির পরিমাণ ৩ কোটি ছাড়িয়েছে। বায়ার এগ্রোর বিক্রি হয়েছে দেড় কোটি, হেকেমেরও বিক্রির পরিমাণ ২ কোটি পার। পপুলার, স্কয়ার, ইনতেফা, রেভেনসহ শতাধিক কোম্পানির কীটনাশক বিক্রির পরিমাণ কমপক্ষে ১শ’ কোটি বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।