গ্রামীণফোনের তিন হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি

দেশের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর মধ্যে গ্রামীণ ফোনের বিরুদ্ধেই সরকারের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তবে প্রতিষ্ঠানটি কৌশল করে এ সব দাবির বিরুদ্ধে মামলা করে বিশাল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগটি ঝুলিয়ে রাখছে বছরের পর বছর। এ ছাড়াও সঠিক সময়ে এনবিআর দাবি করতে ব্যর্থ হওয়ায় শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েও প্রতিষ্ঠানটি পার পেয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাঁচ বছরের আগের দাবিনামা জারি করার ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধ থাকায় ওই অর্থ এখন আর দাবিও করা যাচ্ছে না। তবে সম্প্রতি কিছু তত্পরতার কারণে বেশকিছু রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ স্বীকার করে ওই অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছে গ্রামীণ ফোন। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও লোকবলের অভাবে মোবাইল ফোনের যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালেও বিশাল অঙ্কের ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি ধরাও যাচ্ছে না।

সূত্র জানায়, গ্রাহকের কাছে ভর্তুকি মূল্যে মোবাইল ফোনের সিম বিক্রি করে সেটিকে ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে দেখিয়ে মুনাফা কম দেখানোর মাধ্যমে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আয়কর ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, এ ধরনের খরচ ‘ব্যবসায়িক খরচ’ হিসেবে দেখানো যায় না। এনবিআরের বৃহত্ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) থেকে প্রতিষ্ঠানটির কাছে এ ধরনের অবৈধ খরচ দেখানো প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ফাঁকির অর্থ দাবি করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি মামলা করে তা ঝুলিয়ে রেখেছে। বর্তমানে আদালত এ বিষয়ে এনবিআরের পক্ষে ইতোমধ্যে রায় দেওয়ার পর তা এখন উচ্চ আদালতে আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে মোবাইল ফোন কোম্পানি বাংলা লিংকের সঙ্গে একই ধরনের একটি মামলায় আপিল বিভাগ এনবিআরের পক্ষে রায় দিয়েছে। এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, যেহেতু একটি মামলার রায় উদাহরণ হিসেবে তৈরি হয়ে আছে, ফলে বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী এখন গ্রামীণ ফোনের কাছ থেকে ওই টাকা আদায় করা যায়। কিন্তু গ্রামীণ ফোন ওই অর্থ পরিশোধ করছে না, আপিল বিভাগের রায়ের অপেক্ষায় আছে। আমরা আশা করছি, গ্রামীণ ফোনের সঙ্গে এ মামলার রায়ও এনবিআরের পক্ষেই আসবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামীণ ফোনের বিরুদ্ধে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ এনেছে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগ। এর বাইরে আদায়যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও গ্রাহকের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের ভ্যাট আদায় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই অর্থ যথাসময়ে সরকারের কোষাগারেও জমা দেয়নি। পরবর্তীতে ভ্যাট বিভাগ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দাবিনামা জারি করার পর সম্প্রতি ওই অর্থ পরিশোধ করেছে। এর বাইরে অন্তত সাতটি আলাদা ইস্যুতে প্রতিষ্ঠানটির কাছে এলটিইউ-ভ্যাট বিভাগ দুই হাজার কোটি টাকার বেশি দাবি করেছে। এ সব বিষয় চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটি আদালতে যাওয়ায় ঝুলে আছে সরকারের এ বিশাল অঙ্কের পাওনা।

এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের পাওনা রাজস্ব ঝুলিয়ে রাখার অপকৌশল হিসেবেই মামলা করে বছরের পর বছর ধরে এ সব অর্থ পরিশোধ করছে না গ্রামীণ ফোন। তবে সম্প্রতি এলটিইউ-ভ্যাটের কমিশনার মতিউর রহমান সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে গ্রামীণ ফোনের এ সব ভ্যাট ফাঁকির বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির কাছে সরকারের ২ হাজার ১৫ কোটি টাকা পাওনা হলেও তাদের হিসাবে কোনো ধরনের প্রভিশন রাখেনি। আলোচ্য মামলাগুলো সরকার পক্ষে রায় হওয়ার পর উক্ত রাজস্ব পরিশোধ করা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে কঠিন হবে। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম গ্রহণে বিএসইসি চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানানো হয়।

এনবিআরের এলটিইউ-ভ্যাট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনের সিম বিক্রিকে সিম পরিবর্তন হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে গ্রামীণ ফোন ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে এনবিআর। নানা প্রক্রিয়া পার হয়ে আপিলাত ট্রাইব্যুনাল এনবিআরের পক্ষে রায় দিয়েছে। বর্তমানে ইস্যুটি হাইকোর্টের আপিল জুরিসডিকশনে রয়েছে। ইতোমধ্যে হাইকোর্টের রিট জুরিসডিকশন এনবিআরের পক্ষে রায় দিয়েছে। একই অভিযোগে নতুন করে আরো ৩৭৯ কোটি টাকা দাবিনামা জারি করেছে এনবিআর। ২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহকৃত সিমের ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক মিলিয়ে ৩৪৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেনি। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ায় সুদ যুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৪৫৩ কোটি টাকা দাবি করেছে ভ্যাট বিভাগ। এটিও আপিলাত ট্রাইব্যুনালে শুনানি হয়েছে। বিধি বহির্ভূতভাবে রেয়াত নেওয়ার মাধ্যমে দুই দফায় যথাক্রমে ১শ কোটি ও ২৯ কোটি টাকা ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে একটি আপিলাত ট্রাইব্যুনালে ও অন্যটি হাইকোর্টে বিচারাধীন। এ ছাড়া স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার ওপর প্রদেয় ভ্যাট অনাদায়ী রয়েছে যথাক্রমে ১২ কোটি ৫৬ লাখ, চার কোটি ৮০ লাখ ও ১৯ কোটি টাকা।

ভ্যাট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এ সব মামলার অনেকগুলো রায় ইতোমধ্যে এনবিআরের পক্ষে এসেছে। ফলে চূড়ান্ত রায় এনবিআরের পক্ষেই আসবে বলে আশা করছি।