গাজীপুর কারাগারে শেষ সাক্ষাৎ করলেন মুফতি হান্নানের স্বজনেরা

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সীর সাথে শেষ সাক্ষাৎ করলেন তার স্বজনরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কাশিমপুর কারাগার থেকে আসা কারা কর্তৃপক্ষের চিঠি মুফতি হান্নানের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কোটালিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল ফারুক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কারা কর্তৃপক্ষের চিঠি অনুযায়ী ও মুফতি হান্নানের পরিবারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বড় ভাই আলিউজ্জামান মুন্সী, স্ত্রী রুমা বেগম এবং বড় মেয়ে নিশি খানম গতকাল মঙ্গলবার রাতেই কাশিমপুর কারাগারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ছিলেন বলে মুফতি হান্নানের ছোট ভাই মতিয়ার মুন্সী জানিয়েছেন। তারা গতকাল মঙ্গলবার রাতেই   কোটালিপাড়া-ঢাকায় চলাচলকারী দিগন্ত পরিবহনের টিকেট কাটে এবং রাত ৯টার গাড়িতে কোটালিপাড়ার গ্রামের বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন বলে পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়।
তবে বৃদ্ধা ও অসুস্থ হান্নান মুন্সীর মা পুলিশের কাছে দাবী জানিয়েছেন তিনি যেন তার ছেলের সাথে একবার ফোনে কথা বলতে পারেন।
২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটের হযরত শাহজালালের (র.) মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা হয়। হামলায় আনোয়ার চৌধুরী, সিলেটের জেলা প্রশাসক সহ অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি আহত এবং নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা সহ তিনজন। মামলার বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ৫ আসামির মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদন্ড এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন।
উল্লেখ্য, যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রাপ্ত মহিবুল্লাহ মুন্সী ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আব্দুল হান্নান মুন্সীর আপন ভাই।
যে ভাবে মুফতি হান্নান মুন্সী জঙ্গি নেতা হয়ে উঠেন : ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত দেশের শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সিকে একজন সাদা-সিধে মৌলভী হিসাবেই চিনতেন ও জানতেন গোপালগঞ্জ বাসী। কিন্তু ২০০০সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টার ঘটনায় উঠে আসে মুফতি হান্নানের নাম। অনেকটা রাতারাতি পরিচিতি পেয়ে যায় সে। সেই জঙ্গি নেতার যে কোন সময় ফাঁসির রায় কার্যকর হবে এমন খবরে তার নিজ এলাকা কোটালীপাড়ার লোকজনও ভিষন খুশি। তারা মুফতি হান্নান পর্বের অবসান চান। জেলা সদরের বিসিক শিল্প নগরীর সাবান ফাক্টরীর আড়ালে বোমা তৈরীর কারখানা আবিস্কার হয়। সেই থেকে শুধু গোপালগঞ্জবাসীই নয় দেশবাসী জানতে পারে হরকত-উল-জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সীর নানা জঙ্গি কর্মকান্ডের খবর। আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়া এই জঙ্গি নেতা গ্রেফতার হবার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি কর্মকান্ড চালিয়েছে এমন নানা তথ্য উপাত্তও পুলিশের রেকর্ডে রয়েছে। বিগত ২০০০ সালের ২২ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকা গোপালগঞ্জ-৩ আসনের কোটালীপাড়া সফরে যান। কোটালীপাড়া শেখ লুৎফর রহমান ডিগ্রী কলেজ মাঠে শেখ হাসিনার জনসভা হয়। এর দুই দিন আগে ২০ জুলাই জনসভা স্থলে ও হ্যালিপ্যাডের পাশে একটি পুকুরে ভেসে ওঠা  তারের সূত্র ধরে বেশ কিছু দূরে আবিস্কৃত হয় ৭৬ কেজি ওজনের অতিকায় দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা। এরপর তৎকালিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের উপস্থিতিতে আবিস্কৃত হয় অপর একটি বোমা। আবিস্কৃত হয় গোপালগঞ্জ শহরের বিসিক শিল্প নগরীতে মুফতি আঃ হান্নান মুন্সির “সোনার বাংলা সোফ ফ্যাক্টারীর” আড়ালে বোমার কারখানা। মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম শীর্ষ জঙ্গী নেতা মুফতি হান্নান মুন্সি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন। তার গ্রামের বাড়ী গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার মানুষের মনেও এই রায়কে কেন্দ্র করে ঘৃনা উস্কে উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবী ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর মুফতি হান্নানের মরদেহ কোটালীপাড়ায় নয়, অন্য কোথাও দাফন করা হোক।
জন প্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া : কোটালীপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মুফতি হান্নান বোমা পুঁতে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও  আমাদেও প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে তার নের্তৃত্বে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। সে একজন খারাপ লোক। তার বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তার ফাঁসির দন্ড দ্রুত কার্যকর হওয়া উচিৎ।
জেলা পরিষদ সদস্য নজরুল ইসলাম মুন্নু বলেন, হান্নান মুন্সী বোমা মেরে আমাদেও প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তাছাড়া বহু সাধারণ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। তার বিরুদ্ধে যে দন্ডাদেশ জারি হয়েছে সেটার দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। সে আমাদের কেউনা। তার বাড়ি কোটালীপাড়ায় হলেও তার লাশ আমরা কোটালীপাড়ায় দাফন করতে দেবো না।
জঙ্গি  নেতা মুফতি হান্নানের মা রাবেয়া বেগম বলেন, হান্নান আমার কাছে আমার ছেলে নির্দোষ। তার কোন খারাপ কাজ আমার জানা নেই। সে মুফতি মানুষ। ধর্মীয় পড়ালেখা করেছে। তাই সরকারের কাছে আমার ছেলের মুক্তি চাই।
তবে কোটালীপাড়ার মানুষ মনে করে মুফতি হান্নান মুন্সি কোটালীপাড়াকে কলঙ্কিত করেছে। তারা মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় যেমন কার্যকর দেখতে চান তেমনি এই শীর্ষ জঙ্গীর কবরও যেন কোটালীপাড়ার মাটিতে না হয় তার দাবী তুলেছেন তারা।