খুলনাঞ্চলে দারিদ্রতা বেড়েছে বাড়েনি শিল্প সেক্টরের উন্নয়ন

বি এম রাকিব হাসান, বিশেষ প্রতিনিধি খুলনা: উপকুলীয়াঞ্চলে সুন্দরবন নির্ভর ব্যবসা বানিজ্যে ভাটা, বিভিন্ন বনজ সম্পদ আহরণে বিধি নিষেধ আরোপ, বন্দর ও শিল্প নগরী খুলনার শিল্পাঞ্চলে শিল্প বিকাশে ধ্বস, শিল্প উদ্যোক্তাদের শিল্পায়নে পুঁজি বিনিয়োগে অনীহা, বিগত বিভিন্ন সরকারের আমলে মংলা বন্দর অচল হয়ে থাকা এবং সিডর ও আইলা সহ নানা কারনে খুলনাঞ্চলে দারিদ্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দারিদ্রতা বিমোচনে শিল্প বিকাশের যে ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে তার ব্যাত্যয় ঘটেছে এ অঞ্চলে। যে কারণে বিভিন্ন স্থানে দারিদ্রতা কমলেও খুলনাঞ্চলে বেড়েছে গানিতিক হারে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত সরকার বাস্তবমুখী এবং উৎপাদনমুখী রোডম্যাপে অগ্রসর হলে এই নেতিবাচক অবস্থার অবসান হবে। দারিদ্র বিমোচনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হলে তা ফুলে ফলে সুশোভিত হবে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য। এ অঞ্চলের দারিদ্র বিমোচন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাইল ফলক পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন হলেই এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র বেশ কিছুটা পাল্টা যাওয়ার আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি এক জরিপে প্রকাশ, খুলনা বিভাগে দারিদ্র্যের হার আড়াই শাতংশ বেড়েছে। এরপর সিডর ও আইলার অসংখ্য দরিদ্র পরিবার যুক্ত হয়েছে এই কাতারে। বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কর্মকান্ড নিয়ে ১৯৮৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল সময় দেশে পরিচালিত দুটি অর্থনৈতিক জরিপের তথ্য অনযায়ী, খুলনা জেলায় ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সময়ে ১০ জনের বেশি শ্রমিক বা কর্মচারি কাজ করে এমন স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। ১৯৮৬ সালে এই জাতীয় এক হাজার ৫৩৮ টি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিল এক লাখ ১৭ হাজার ২১০ জন। ২০০৫ সালে এই সংখ্যা কমে হয়েছে এক হাজার ২০১টি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে হয়েছে ৫৪ হাজার ৬২৮ জন। ১০ বছর বাদে ৩শ ৩৭টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে চাকুরি হারিয়ে বেকার হয় ৬২ হাজার ৮শ ৪২ জন। আর্থিক সংকটে পড়ে এই সকল কর্মহীন লোকের পরিবার পরিজন। ৭০ এর দশক শিল্পের এই ক্রমাবনতির সময়ই এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে রাষ্ট্রায়ত্ত বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি আর্থিক সহযোগীতা প্রত্যাহার শুরু করার পর সরকার নিয়ন্ত্রিত এই সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। শিল্প ব্যাংক খুলনা শাখা বন্ধের আগে এখান থেকে ঋন সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ৬০টি প্রকল্পের মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ৩৯টি প্রকল্প। যার সিংহভাগই ঋনখেলাপি এবং বন্ধ। শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি কাজী আমিনুল হক বলেন, বিগত দুই দশকে খুলনা শহরের শিল্পায়ন ব্যর্থতার দায়ভার শাসক প্রতিটি দলের। একসময়ের জমজমাট শিল্পনগরের নিকটেই নদীবন্দর, ৪০ কি:মি: মধ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মংলা, রেলপথ, আধুনিক সড়ক যোগাযোগের মত সকল সুবিধা থেকে শুধু ও ভুল নীতির জন্য খুলনার শিল্পাঞ্চল এখন এক মৃত নগরী। খুলনার খানজাহান আলী থানার কুটিরশিল্প সংস্থার শিল্পনগরে অবস্থিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানাও বিবর্ণ চিত্র চোখে পড়বে। ভাঙ্গা রাস্তা আর বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানার চেহারা বলে দেয় একানকার দুরাবস্থার কথা। আশির দশকে খুলনা বিভাগের স্থানীয় চাহিদা মেটাতেই শিল্প ব্যাংকের কাছ থেকে ঋন নিয়ে গড়ে উঠা ফরিদপুর টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডসহ তেল উৎপাদক কারখানা, পলিথিনসহ প্রায় ১৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বড় বড় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বরফকল, বিস্কুট তৈরির কারখানা, প¬াস্টিক কারখানা, আটা ময়দার মিলের ওপর । বিসিকের খুলনা বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক বলেন, বিগত তিন দশকে পাটশিল্পে সংশি¬ষ্ট শিল্পগুলোর অবস্থা খারাপ।
সূত্রমতে, দারিদ্র বিমোচনের জন্য বর্তমান সরকারের বিভিন্ন চলমান প্রকল্প রয়েছে। তার পাশাপাশি এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী খুলনার শিল্পাঞ্চলকে চাঙ্গা করতে বিগত চারদলীয় জোট সরকার প্রধান ব্যাক্তিগতভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকার প্রধান বিশেষ করে তিনি নির্বাচনের পূর্বে খুলনাবাসীকে যে ওয়াদা করেছিলেন তা রক্ষার জন্য কিছু কাজ করলেও বাকীগুলো এখনও পূরণ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং খুলনায় এসে খালিশপুর জুট মিল চালু করেছেন। মংলা বন্দর আধুনিকায়ন হচ্ছে। বন্দরে আগের তুলনায় বেশি বেশি জাহাজ ভিড়ছে। খুলনা শিপইয়ার্ড এখন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সবকিছু বাস্তবায়ন এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু অনেক আশাই সরকার পুরন করতে পারেনি।