খালেদার জামিন শুনানিতে হৈ চৈ, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়

নিজস্ব সংবাদদাতা : বেগম খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়ে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আইনজীবীরা বেশ কয়েকবার হৈ চৈ করেন। আর একবার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে এবং একবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘তার (অ্যাটর্নি জেনারেল) এই মামলায় শুনানির এখতিয়ার নেই। …কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল আইনের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক উদ্দেশে শুনানি করছেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘অবশ্যই (অধিকার) আছে।’

এ সময় হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়। এ সময় মাহবুবে আলম ও মোহাম্ম আলী পরস্পরের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে কথা বলেন।

এ সময় প্রধান বিচারপতি খালেদা জিয়ার আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে কথা বলবেন না।’

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পাশাপাশি ১৯ ফেব্রুয়ারি জামিন আবেদন করেন বিএনপি নেত্রীর আইনজীবীরা।

২২ ফেব্রুয়ারি আপিল গ্রহণ, ২৫ ফেব্রুয়ারি জামিন আবেদনের শুনানির পর ১২ মার্চ চার মাসের জামিন পান খালেদা জিয়া। এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন।

আর এই শুনানি হয় আজ মঙ্গলবার। প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বেঞ্চে এই শুনানিতে এই আবেদনে অ্যাটর্নি জেনারেল বক্তব্য রাখতে পারেন কি না, এ নিয়ে বিতর্কে জড়ান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।

অ্যাটর্নি জেনারেলের যুক্তি উত্থাপনের সময় হৈ চৈ

মাহবুবে আলম বলেন, এই মামলার বিচারে বিলম্ব ঘটাতে সব ধরনের চেষ্টা করেছেন খালেদা জিয়া। নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে অসংখ্যবার হাইকোর্টে এসেছেন। নিম্ন আদালতে এই মামলার বিচার শেষ হতে ৯ বছর লেগেছে।

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল ‘বিলম্বের’ সব ‘চেষ্টার’ একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরেন।

এসময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদিন দাঁড়িয়ে বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল এসব কী বলছেন? আমরা তো বুঝতে পারিছি না। এটা তো জামিন আবেদনের শুনানি।’

এ সময় বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা সমস্বরে জয়নুল আবেদিনের বক্তব্য সমর্থন করেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালে সকলেই চুপ করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমি রেকর্ড থেকে বলছি।’

মাহবুবে আলম বলেন, ‘তার (খালেদা জিয়া) আইনজীবীরা বলছেন যে তিনি অসুস্থ। তার হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে। এটাই যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে খালেদা জিয়ার হাঁটার দরকার কী? তার বিশ্রামে থাকা প্রয়োজন। তিনি কারাগারে বিশ্রামে রয়েছেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেলের এই বক্তব্যে পুরো আদালত কক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।

সাজার বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপিলের বিষয়ে শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরি হয়েছে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এখন জামিনের পরিবর্তে তার আপিলের শুনানির নির্দেশ দেওয়া হোক। আগে আপিল নিষ্পত্তি হোক। সেখানে তিনি খালাস পেলে আমাদের আপত্তি থাকবে না।’

‘খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার অপরাধ সাধারণ একজন মানুষের অপরাধের মতো নয়। সারা বিশ্বে রাষ্ট্র প্রধানের অপরাধকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।’

এ সময় ভারতের বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্র জয়ললিতা সেন, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাই, ব্রাজিলের সাবেক প্রেডিসেন্ট লুলা ডি সিলভার কারাদণ্ডের উদাহরণ দেন মাহবুবে আলম।

এ সময় জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘জামিনের আবেদনে এসব কি বলছেন?’

এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা সমস্বরে চিৎকার করে ওঠেন।

তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আগে তাকে (অ্যাটর্নি জেনারেল) বলতে দিন।’

এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল নিম্ন আদালতের বিচার কার্যক্রম, মামলার বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলতে থাকেন।

এক পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দাঁড়িয়ে বলেন, ‘এটা জামিন আবেদনের শুনানি। এখানে মামলার বিষয়বস্তু আসতে পারে না।’

সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা সমস্বরে চিৎকার করে ওঠেন।’

দুদকের আইনজীবী যা বললেন

হাইকোর্ট যে চার যুক্তিতে খালেদা জিয়াকে জামিন দেয় তার একটি ছিল তার কম সাজা।

তবে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, খালেদা জিয়ার স্বল্প সময়ের সাজা হয়নি। তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। …এটা কি কম সাজা? দুই বছরের সাজায় আপিল বিভাগ জামিন বাতিল করলে খালেদা জিয়ার জামিনও বাতিলযোগ্য।’

‘সাজা কম বলতে কত বছর বা কত মাস ধরা হবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি।’

১৯৯১ সালে আপিল বিভাগের মামলার দুই বছরের সাজার পর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আপিল বিভাগে বাতিল হয়েছে বলেও জানান দুদকের আইনজীবী।

খুরশিদ বলেন, ‘যদি দেখা যায় মূল আপিলের শুনানি শুরু করতে অনেক বছর সময় লাগতে পারে, সেক্ষেত্রে হাইকোর্ট জামিন দিতে পারে। তাও এত অল্প সময়ে নয়।এমন যদি হতো খালেদা জিয়া দুই বা আড়াই বছর কারাগারে রয়েছে সেক্ষেত্রে জামিন বিবেচনা করলে আপত্তি থাকত না।’

খালেদা জিয়ার বয়সও হাইকোর্টের জামিন দেয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনা ছিল। এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী বলেন, ‘বয়স, সামাজিক বিবেচনায় নিম্ন আদালত খালেদা জিয়াকে সাজা কম দিয়েছে। এটা ঠিক হয়নি। একই বিবেচনায় হাইকোর্টের জামিন মঞ্জুর করাও ঠিক হয়নি।’

প্রধান বিচারপতি জানতে চান, ‘জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে বয়স বিবেচনা করাটা কোনো যুক্তি হতে পারে না-এটাই তো বলতে চাচ্ছেন?

দুদকের আইনজীবী বলেন, ‘হ্যাঁ’।

‘নিম্ন আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া আদালতের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে গেছেন। এভাবে তিনি জামিনের অপব্যবহার করেছেন। নিম্ন আদালতের রায়ে এটা উল্লেখ থাকার পরও খালেদা জিয়াকে জামিন দেওয়া হাইকোর্টের মারাত্মক অবৈধ ও ভুল কাজ হয়েছে। তাই এ জামিন বাতিলযোগ্য।’

খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়ার আরেক বিবেচনা তার অসুস্থরার বিষয়ে দুদকের আইনজীবী বলেন, ‘কিন্তু তার অসুস্থতার পক্ষে একটিও ডকুমেন্ট নেই।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে কি আদালত জামিন দিতে পারে না?

দুদকের আইনজীবী বলেন, ‘সেক্ষেত্রে ডকুমেন্ট থাকতে হবে।’

খালেদার আইনজীবী যা বললেন

এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দুদক জামিন বাতিলের জন্য একটি মামলা উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছে। কিন্তু আমি এই বছরের একটি উদাহরণ দিচ্ছি যেখানে দুদকের মামলায় ১০ বছর সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। আর আপনারা ফুলকোর্ট সে জামিন বহাল রেখেছেন।’

এ সময় প্রধান বিচারপতি ওই মামলাটি সম্পর্কে জানতে চান।

এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ঝিনাইদহের সাবেক এমপি মশিউর রহমান (বিএনপি নেতা)।’

‘মামলায় কিছু থাকুক আর নাই থাকুক যেনতেনভাবে খালেদা জিয়াকে সাজা দিতে হবে এটাই মূল উদ্দেশ্য। খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার জন্যই এটা করা হচ্ছে। আর অ্যাটর্নি জেনারেল বিচার বিলম্বের বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সত্য নয়।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা দেখছি নিম্ন আদালতে বিচার শেষ হতে ৮/৯ বছর লেগেছে।’

খালেদা জিয়ার আইনজীবী বলেন, ‘এর মধ্যে ৭ বছরই হাইকোর্টে মামলা স্থগিত ছিল।’

এ পর্যায়ে আদালতে শুনানি মূলতবি করা হয়।

Inline
Inline