কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন স্থগিত

নিজস্ব সংবাদদাতা ; সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আলোচনার পর সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা এসেছে।

সোমবার বিকালে সচিবালয়ে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আলোচনা শেষে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে হাসান আল মামুন মে মাস পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি ৭ মে পর্যন্ত স্থগিতের ঘোষণা দেন। এর আগে বৈঠকে কোটা পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশ্বাস দেন ওবায়দুল কাদের।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে পাঁচ ধরনের মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা রয়েছে। এটিকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।

রবিবার রাজশাহীর শাহবাগে এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নেয়।

সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও শুরু হয় আন্দোলন। আর আগের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামানের বাড়িঘরে ভাঙচুর হয়।

এই পরিস্থিতিতে রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আন্দোলনকারীদেরকে আলোচনার প্রস্তাব দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক।

আর সোমবার বিকালে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে আন্দোলনকারীদের ১০ জন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকে বসেন ওবায়দুল কাদের।

বৈঠকে কাদের ছাড়াও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, মুক্তযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, উপ দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এস এম কামাল হোসেন, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াও উপস্থিত ছিলেন।

আর কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মী কানিজ ফাতেমা, আফসানা সাফা, একরামুল হক, আল ইমরান হোসাইন, লীনা মিত্র, আরজিনা হাসান, লুবনা জাহান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় ব্রিফিং করে দুই পক্ষ। এ সময় চলমান আন্দোলন ৭ মে পর্যন্ত স্থগিত করার ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীদের সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদেও আহ্বায়ক হাসান আল মামুন।

এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোটা ব্যবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আন্দোলনকারীদের নেতা হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমরা আমাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তিনি কোটা পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সেতুমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। সেতুমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে এ কোটা পদ্ধতির একটি যৌক্তিক সংস্কার করে ছাত্রদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে।’


‘এ জন্য আমরা আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এ আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করছি।’

রবিবার ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে আটক ৪০ শিক্ষার্থীর মুক্তির দাবিতেও সায় দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। আন্দোলনকারীদের নেতা বলেন, ‘সরকার আমাদের আশ্বাস দিয়েছে এ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলনকারী যেসব ভাই বোনেরা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হবে। পাশাপাশি যারা আহত হয়েছেন তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবে সরকার।’

এক প্রশ্নে হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমরা একটি কথা বিশ্বাস করি প্রতিটি যৌক্তিক দাবির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। ছাত্রসমাজের আস্থা আছে দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রতি। যৌক্তিক দাবি অবশ্যই মেনে নেবেন।’

‘সরকার রিজিড নয়’

পরে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এখানে সরকার রিজিড (অটল) অবস্থান নেই। আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি তাদের দাবী যৌক্তিককতা আমরা ইতিবাচক ভাবে আমরা দেখব।’

কোটা পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় নির্দেশ দেয়ার পর এই বৈঠকের আগেও তাকে ফোন করেছেন বলে জানান কাদের। বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বলে দিয়েছেন, এটা রিলেটেড অথরিটিতে কোটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য বলে দিয়েছেন।’

শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের সমালোচনা করে কাদের বলেন, ‘আমি আন্দোলনকারীদের বলতে চাই, এ আন্দোলনের জন্য সারাদেশে সবগুলো সড়কে গাড়ি চলতে পারিনি। এখানে তোমাদের (আন্দোলকারীদে লক্ষ্য করে) বাবা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি চিকিৎসা নিতে শহরে আসতে না পেরে মারা যায় তাহলে কী হবে?’ কাজেই তারাতো কোন অপরাধ করেনি।’

রবিবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহতদের সরকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে বলেও জানান কাদের। বনে, ‘তাদের (আন্দোলনকালী) দাবি, পুলিশের হামলায় আহত হয়েছেন। আমি বলি. যার হামলায়ই আহত হোক আমরা তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। এখানে তারা কথা দিয়েছে, তাদের চলমান আন্দোলন আগামী ৭ মে পর্যন্ত স্থগিত করবে।’

‘কোটা সংস্কারের সঙ্গে ভিসির কী সম্পর্ক?’

রবিবার দিবাগত গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামানের বাসভবনে হামলার সমালোচনা করেন কাদের। বলেন, এই আন্দোলনে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।

সড়ক মন্ত্রী বলেন, ‘দে (আন্দোলনকারী) ডিট নট ওয়েন্ট টু গো নন ভায়োলেন্স। কিন্ত গতকাল একটি টেরিফিক ভায়োলেন্স হয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাড়িতে যে তাণ্ডব চলেছে, ভিসির পরিবারকে বাগানের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।’

‘সাংবাদিকরা একথা জানেন। সে অবস্থা আমরা ভালো লাগেনি। এ তাণ্ডবের সাথে যারা জড়িত বলে প্রমাণিত হবে তাদের শাস্তি পেতে হবে।’

‘কারণ, আমি তাদের একটি প্রশ্ন করেছি কোটা সংস্কারের সঙ্গে ভিসির কী সম্পর্ক? তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। সেখানে তিনি এবং তার বাসভবন ও পরিবার কেন আহত হবেন?’

‘তারা (আন্দোলনকারী) আমার সাথে একমত হয়েছেন। তবে আমি ডিএমপি কমিশনারকে বলেছি কোন নিরীহ কেউ যেন গ্রেপ্তার হয়ে না থাকে।’

‘যারা সত্যিকারের ভায়োলেটার, যারা তাণ্ডব করেছে। ভিডিও ফুটেজে ধরা পরবে তাদের শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু যারা ইনোসেন্ট, তাদের ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’