কাশ্মির ইস্যুতে মধ্যস্থতা করতে চায় চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীন কি তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান পরিবর্তন করে কাশ্মির বিতর্কে হস্তক্ষেপ করার রাস্তা বেছে নিয়েছে? এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে কারণ ভারত শাসিত কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে ‘দুর্ভাগ্যবশত চীনও এখন কাশ্মিরে নাক গলাচ্ছে।’বিবিসির খবরে বলা হয়, সম্প্রতি কাশ্মির ইস্যুতে মধ্যস্থতা করারও প্রস্তাব দিয়েছে চীন, যা ভারত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে চীন যে ক্রমেই আরও বেশি করে কাশ্মির বিতর্কের ভেতর ঢুকতে চাইছে সে ইঙ্গিত স্পষ্ট।কিন্তু কীভাবে আর কেন বেইজিং হঠাৎ করে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে?আন্তর্জাতিকভাবে চীন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত হলেও কাশ্মির বিতর্কে তারা বরাবর একটা ভারসাম্যের নীতি নিয়েই চলেছে – এবং এই সমস্যা দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান করতে হবে, ভারতের এই বক্তব্যেও কখনও আপত্তি জানায়নি।কিন্তু গত সপ্তাহেই প্রথম কাশ্মির সঙ্কটে চীন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেয়। এরপর শনিবার দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জম্মু ও কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও চীনের বিরুদ্ধে কাশ্মিরে হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনেন।মেহবুবা মুফতি বলেন, ‘কাশ্মিরের লড়াইতে বাইরের শক্তিও যে সামিল আছে তা সবারই জানা -আর কপাল খারাপই বলব, চীনও এখন এখানে নাক গলাতে শুরু করেছে। বৈদেশিক শক্তিরাই আসলে জম্মু ও কাশ্মিরের পরিবেশকে নষ্ট করছে।’মুফতি এর বেশি কিছু ভেঙে না-বললেও কাশ্মিরে চীনের ভূমিকা নিয়ে এর পর থেকেই তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে।দিল্লি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-ভারত সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শ্রীমতি চক্রবর্তীর ধারণা, কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে যাওয়া চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরে ভারতের তীব্র আপত্তিই সম্ভবত কাশ্মির প্রশ্নে চীনকে নতুন করে ভাবাচ্ছে।‘এই করিডর কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে যাওয়ায় ভারত সেটাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে মনে করছে। হয়তো তাই চীন মনে করছে এই পরিস্থিতিতে যদি আলোচনার টেবিলে সব পক্ষকে আনা যায় তাহলে ভারতকে এটা বোঝানো যাবে যে এই করিডর কোনও আঘাত-টাঘাত কিছু নয়, বরং একটা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ।’‘পাশাপাশি চীন ভারতকে এটাও বলছে যে ভুটানের জন্য তোমরা লড়ছ, এখন যদি পাকিস্তানও কোনো তৃতীয় দেশকে বলে আমাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে তোমরা এগিয়ে এস, তখন কী হবে? কাজেই একটা হুমকিও আছে আবার আলোচনার সুরও আছে, যেটা বহুদিন ধরেই চীনের অনুসৃত নীতি’- বলছিলেন অধ্যাপক চক্রবর্তী।ভারতকে এভাবে নরমে-গরমে রাখাটা যদি চীনের একটা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আর একটা উদ্দেশ্য মিত্র পাকিস্তানকে সাহায্য করা- বলছিলেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার বি ডি মিশ্রা।ভারতের সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার কথায়, ‘মেহবুবা মুফতি ঠিক কেন ওই মন্তব্য করেছেন তা বলা মুশকিল- তবে ভারতকে বিপাকে ফেলার কোনো সুযোগই যে চীন ছাড়বে না তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর সেটা যদি পাকিস্তানের পক্ষে যায় তা হলে তো কথাই নেই।’তিনি আরও বলছেন, ‘কাশ্মিরের হিংসা যে পুরোপুরি পাকিস্তানের ইন্ধনপুষ্ট তা সবাই জানে, এখন চীনও তাতে যোগ দিচ্ছে এই সন্দেহ করার কারণ আছে।’কিন্তু ইসলামি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে চীনের যে অবস্থান সেটা এতদিন কাশ্মির থেকে তাদের দূরে রেখেছিল বলে মনে করা হয়, সেটাও কি তাহলে বদলাচ্ছে?শ্রীমতি চক্রবর্তী বলছেন, ‘চীনের নিজেরও ইসলামিক জঙ্গিবাদের দিক থেকে বড় বিপদ আছে, শিনজিয়াং-এ রোজই নতুন নতুন জঙ্গি তৈরি হচ্ছে। তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের কট্টর জঙ্গিদেরও যোগসাজশ আছে, যেটা ভাঙার জন্য চীন এতদিন তেমন চেষ্টা করেনি। কিন্তু এই জঙ্গিরাও কাশ্মির ইস্যুকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, অবশ্যই সেটা চীনের মাথায় আছে।’‘তবে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মির বা তথাকথিত আজাদ কাশ্মিরে যে চীনা সেনাবাহিনী বা পিএলএ-র সদস্যরা বহুদিন ধরে মোতায়েন আছে এটা জানা কথা। করিডর তৈরি হয়ে গেলে সেটা রক্ষার জন্য নিশ্চয় আরও বেশি করে চীনা সেনা সেখানে আসবে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে দূরে সরিয়ে রাখলে অসুবিধা – বরং তাদেরকেও এই উদ্যোগে সামিল করতে পারলেই চীনের লাভ। কে না জানে, তাদের জন্য অর্থনৈতিক স্বার্থটাই সবার আগে’- বলছিলেন শ্রীমতি চক্রবর্তী।অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থেই কাশ্মির প্রশ্নে চীন তাদের অবস্থান বদলাচ্ছে- ভারতে পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই তেমন ধারণা।কাশ্মির ইস্যুতে চাপ দিয়ে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডেও দিল্লিকে তারা রাজি করাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয় হবে।