কবি সুফিয়া কামালের জন্মবার্ষিকী আগামীকাল

ঢাকা, ১৯ জুন, ২০১৮ : বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, লেখক ও নারী আন্দোলনের পথিকৃত বেগম সুফিয়া কামালের ১০৭তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল ২০ জুন। ১৯১১ সালের এইদিনে কবি বরিশালের শায়েস্তাবাদ গ্রামে মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী কবি সুফিয়া কামাল একধারে কবি, লেখক, নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক দেশগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব। তার মায়ের নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন এবং পিতা সৈয়দ আবদুল বারী।

দিবসটি উপলক্ষে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথকভাবে বাণী দিয়েছেন।
সেই আমলে মেয়েদের পড়ালেখা ও ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করার খুব একটা সুযোগ ছিল না। সুফিয়া কামাল তার মায়ের কাছে বাড়িতেই পড়াশোনা করে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। তার কর্ম জীবনের প্রথম দিকে দেশভাগ পর্যন্ত প্রায় তিন দশক কলকাতায় বসবাস করেন। পনের বছর বয়সে ১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ সওগাত পত্রিকায় প্রকাশ পায়। সেই থেকে কলকাতা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় তার কবিতা ও গল্প প্রকাশ পেতে থাকে। লেখালেখির বিভিন্ন সময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও শরৎচন্দ্র’র সাহচার্য পান। সাহিত্য চর্চা তথা লেখালেখির পাশপাশি তিনি নারী জাগরণের প্রতীক বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও কার্যক্রমকে নিজের কাজের পাথেয় হিসেবে বেছে নেন। ফলে নারীদের অধিকার আদায় ও নারীর ক্ষমতায়নের সংগ্রামে লিপ্ত হন। তার প্রথম গ্রন্থ ছোটগল্পের বই ‘কেয়ার কান্তা’ প্রকাশ পায় ১৯৩৭ সালে এবং প্রথম কবিতার বই ‘সাঝের মায়া’ প্রকাশ পায় ১৯৩৮ সালে। ‘সাঝের মায়া’ গ্রন্থের মুখবন্ধ লিখেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এ বইয়ের প্রশংসা করেন।
কর্মজীবনে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত কবি ‘কলকাতা কর্পোরেশন স্কুল’ এ কয়েকবছর শিক্ষকতা করেন। পরে ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কবি তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে নারী আন্দোলন ও পরে ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে ‘কচিকাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬১ সালে ‘ছায়ানট’-এর সভাপতি, ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের সময় মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি, ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠন এবং এই সময়ে অসহযোগ আন্দোলনে নারী সমাজের নেতৃত্ব দেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলসহ সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী সংগ্রামে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর কবি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।
কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে, সাঝের মায়া (১৯৩৮), মায়া কাজল (১৯৫১),মন ও জীবন (১৯৫৭), প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮), উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪), দিওয়ানা (১৯৬৬), অভিযাত্রিক (১৯৬৯), মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০), মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২)। গল্পের বই ‘কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭), ভ্রমন বিষয়ক বই ‘সোভিয়েতের দিনগুলো’, স্মৃতিকথা-একাত্তরের দিনগুলো, আত্মকথা-‘একালে আমাদের কাল’সহ রয়েছে কয়েকটি শিশুতোষ বই এবং একটি অনুদিত গ্রন্থ।
সাহিত্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদানের জন্য জীবিতকালে কবি সুফিয়া কামাল প্রায় ৫০টি পুরস্কার লাভ করেন। এ সবের মধ্যে রয়েছে, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২), লেনিন পদক (১৯৭০, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫),স্বাধীনতা দিবস পদক। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে ‘তমসা-ই-ইমতিয়াজ’ পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিলে কবি সুফিয়া কামাল তা প্রত্যাখান করেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেত্রী রীনা আহমেদ জানান, কবির জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আগামী ২৭ জুন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এতে ‘কবি সুফিয়া কামাল স্বারক বক্তৃতা’ রাখবেন বিশিস্ট সাংবাদিক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকুসদ। নারী নির্যাতনবিরোধী কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখায় অনুষ্ঠানে তিনজনকে চলতি বছরের ‘কবি সুফিয়া কামাল সন্মাননা’ প্রদান করা হবে। ঢাকার সেগুন বাগিচায় কবি সুফিয়া কামাল ভবনে এই কর্মসূচি পালিত হবে।

Inline
Inline