এখন নিজেকে আড়াল করছেন ফরহাদ মজহার

নিজস্ব প্রতিবেদক : কথিত অপহরণের পর হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সময় বিদেশি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আলোচিত কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার বলেছিলেন, সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেই তিনি সব ‘ফাঁস’ করবেন। হাসপাতাল থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করবেন, বলেছিলেন তার স্বজনরাও। কিন্তু সেই ফরহাদ এখন আড়াল করছেন নিজেকে। দেখা দিচ্ছেন না গণমাধ্যমকর্মীদের। বন্ধ রেখেছেন দুটি মোবাইল ফোনও।গত ৩ জুলাই ভোরে শ্যামলীর বাসা থেকে বের হওয়ার পর ফরহাদ মজহারকে পাওয়া যাচ্ছিল না। এর মধ্যে তাঁর অপহৃত হওয়ার গুঞ্জন আসে। আর একই দিন শেষে রাতে খুলনা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে একটি বাস থেকে উদ্ধার করা হয় ফরহাদ মজহারকে।উদ্ধারের পর ৪ জুলাই ফরহাদ মজহারকে ঢাকায় আনার পর আদালতে নেয়া হলে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।এ ঘটনায় ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতা আদাবর থানায় একটি অপহরণের মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম বিভাগ। মামলা তদন্তকালে ফরহাদ মজহার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একটি বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা বলতে আমি মোটেও ভীত নই। সময়মত সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত বলব।’কিন্তু পুলিশের তদন্তে ঘটনা অন্য মোড় নেয়। যেদিন ফরহাদ মজহার অপহৃত হয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছিল, একই দিন তিনি খুলনা নিউমার্কেটে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেরিয়েছেন। এই ভিডিওর পাশাপাশি একটি দোকানে গিয়ে টাকা গুণে গুণে তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকাও পাঠান।পরে ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন ডেকে পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ফরহাদ মজারের অপহরণের প্রমাণ মেলেনি। অর্চনা নামে এক নারীর সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক ছিল। একবার তিনি গর্ভপাতও করান ওই নারীকে। পরে আবারও ওই নারী গর্ভবতী হন। আর ওই নারীকে টাকা দিতেই ওই ভোরে ফরহাদ বাসা থেকে বের হয়েছিলেন এবং স্ত্রী ফরিদা আখতারের কাছ থেকে টাকা নিতে চেয়েছিলেন তিনি।ফরহাদ মজহারের অপহরণের ঘটনার মামলায় সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দিও দেন অর্চনা রানী। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, অপহরণের দিন তার সঙ্গে অন্তত ছয়বার মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন ফরহাদ মজহার। প্রায় দশ বছর আগে ফরহাদ মজহারের এনজিও উবিনীগে চাকরি করতেন তিনি। চাকরি করার সুবাদে সম্পর্ক গড়ায় পরকীয়ায়।পুলিশ জানায়, কথিত অপহরণের দিন ফরহাদ মজহার তার স্ত্রীর সঙ্গে ১০ বার এবং অর্চনার সঙ্গে ছয় বার ফোনে কথা বলেন এবং সন্ধ্যায় খুলনার একটি দোকান থেকে তাকে ১৫ হাজার টাকাও পাঠান।স্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে অপহরণের প্রচার বন্ধ করার কথাও বলেন ফরহাদ মজহার। এর সব রেকর্ড পুলিশের কাছে আছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটির প্রধান। আর স্ত্রীর সঙ্গে ফরহাদ মজহারের কথোপকথনের একটি ক্লিপ প্রকাশও হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।পুলিশ প্রধানের এই সংবাদ সম্মেলনের আগেই ফরহাদ মজহার ঢাকার বারডেম হাসপাতাল থেকে শ্যামলীর নিজ বাসভবনে ফিরে যান। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করে দুইজন সংবাদকর্মী তার সেই বাসায় ঢুকতে পারেননি। মোবাইলে ফোনেও তাকে পাওয়া যায়নি। কারণ, যে দুটি ফোনে তিনি বরাবর কথা বলতেন, সেই দুটি নম্বরই তিনি বন্ধ করে রেখেছেন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও তিনি আর এখন সক্রিয় নন।
আইজিপির ওই সংবাদ সম্মেলনের পর ফরহাদ মজহার একদিন বাড়ির বাইরে এসেছিলেন। তবে ব্যক্তিগত কাজে নয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত ১৮ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে স্বস্ত্রীক আসেন ফরহাদ মজহার। তবে না তিনি, তা তার স্ত্রী বা অন্য কেউ বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি।
ফরহাদ মজহার কবে সংবাদ সম্মেলন করবেন, তা বিদেশি গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী কবে মুখ খুলবেন-জানতে অগত্যা ফোন করা হয় তার স্ত্রী ফরিদা আখতারকে। তবে তিনিও কথা বলতে নারাজ।প্রশ্ন শুনে খানিকটা ক্ষিপ্ত হয়ে ফরিদা বলেন, ‘আপনারা এই ঘটনা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। আপাতত এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে চাই না।’বারডেম হাসপাতালে ফরহাদ মজহার বলেছিলেন সময়মত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদা বলেন, ‘আমি এখন এই বিষয়টা নিয়ে কোন কথা বলতে চাচ্ছি না। ধন্যবাদ।’এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী সংস্থ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেলের সঙ্গে কথা হয়েছে । তিনি বলেন, ‘আপনারা এই ঘটনার সবই লিখেছেন। আর লেখার মত নতুন কিছু নেই।’ তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। আপাতত বলার মত কিছুই নেই। আইনের বাধ্যবাধকতা মেনেই এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।’