এই সরকারের কোনো আইন মানেন না ফখরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক : বর্তমান সরকারের কোনো বৈধতা নেই দাবি করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই সরকারের কোনো আইন তারা মানেন না।

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখছিলেন বিএনপি নেতা। বিএনপির পক্ষ থেকে এর আয়োজন করা হয়।

আলোচনায় ঢাকায় যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন,রাশিয়া, তুর্কি, ভিয়েতনামের দূতাবাসের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

দশম সংসদের শেষ অধিবেশনে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল নিয়ে গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নানা উদ্বেগ আছে। এই আইনের ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কঠিন হয়ে যাবে বলে সাংবাদিক নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দিয়ে বলা হচ্ছে, এই আইন নিয়ে উৎকণ্ঠার কারণ নেই। সুসাংবাদিকতা করলে ভয়ের কারণ নেই।

এরই মধ্যে সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এতে বিলটি আইনে পরিণত হয়েছে। এখন বিধি প্রণয়নের পরই আইনের প্রয়োগ হবে।

বিএনপি এই আইন পাসের শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে। তারা বলছে, জনগণের কণ্ঠরোধ করতেই সরকার আইনটি পাস করেছে।

ফখরুল বলেন, ‘এই সরকারের কোনো আইন আমরা মানি না৷ কারণ যে সংসদ তা পাস করে তাদের বৈধতা নেই। এটা একটি প্রতারক সরকার৷’

এই আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়ার পর জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক এবং টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো কথা বলেছে আইন, তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর সঙ্গে। আর সরকারের পক্ষ থেকে সব উদ্বেগ বিবেচনায় নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়।

সরকার যদিও বলছে, সব উদ্বেগ আমলে নিয়েই বিলটি পাস হয়েছে, তবে সম্পাদকরা অভিযোগ করেছেন, তাদের উদ্বেগ বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

ফখরুল বলেন, ‘সরকারের মন্ত্রীরা সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করে বললেন, তাদের আপত্তির বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সংশোধনের চেষ্টা করবেন। কিন্তু একবারে কাছেই গেলেন না। উনি (প্রধানমন্ত্রী) দেশে এসে বললেন, যারা মিথ্যা প্রচার করবে তাদের জন্য সমস্যা।’

বক্তব্যের শুরুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা উল্লেখ করে বিএনপি নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বোধহয় কালো হরিণ চোখ দেখতে পেয়েছেন ডিজিটাল আইনের মধ্য দিয়ে এই সরকারকে রক্ষা করার জন্য। অত্যন্ত দুর্ভাগ্য, হতাশার,ক্ষোভের কথা আমরা যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, সে যুদ্ধের আগে পরে যে স্বপ্ন দেখেছি, এই সরকার তা ভেঙে খান খান করে দিয়েছে।’

‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, বাকশাল কায়েমের কথা আমরা ভুলে যাইনি। এরাই তো গত ১০ বছর ধরে একটার পর পর একটা আইন তৈরি করে চাপিয়ে দিয়েছে।’

আলোচনায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনও। এটি কালো আইন। অলিখিত বাকশাল ও একদলীয় শাসন পাকাপোক্ত করতেই তড়িঘড়ি করে এই আইন পাস করা হয়েছে।

এই আইনের বিভিন্ন ধারার সমালোচনা করে বিএনপি নেতা বলেন, ‘গণতন্ত্র তো দূরের কথা, রাজতন্ত্রেও বোধ হয় এমন কোনো আইন নেই। এটা ডিজিটাল নয়, ফ্যাসিস্ট সরকারের নিরাপত্তার জন্য আইন করা হচ্ছে।’

‘এটা সরকারের শেষ সময়, চেষ্টা করছে খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু বাকশাল কায়েম করে তারা টিকে থাকতে পারেনি, এবারও পারবে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘কেন এত তাড়াহুড়ো করে দ্রুত এই আইন পাস করতে হলো? সরকারের অপকর্মের কথা কেউ যেন প্রকাশ করতে না পারে, সে জন্য?’

‘এই আইনের বিরুদ্ধে আমরা চুপ করে থাকব নাকি এর প্রতিবাদে কথা বলব, সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরকে এবং জনগণকে নিতে হবে দেশের স্বার্থে। এই আইনটি গণতান্ত্রিক হয়নি, যখন গণতন্ত্র আসবে, তখন এই আইন থাকবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত হয়ে থাকুক। এটা কালোর থেকেও কালো আইন।’

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনী প্রকল্পের একটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই প্রকল্পের মধ্যে আরও আছে গণতন্ত্রের মা কে কারাগারে পাঠানো, ইভিএম ব্যবহার, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা। সেই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে মৌলিক অধিকার হরণ করতে হবে। এখানে তাই হচ্ছে।’

বিএনপি আয়োজিত সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ। সঞ্চালনা করেন প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, রুহুল আলম চৌধুরী, সাংঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, বাংলাদেশের খবর সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন, হলিডে সম্পাদক সৈয়দ কামাল উদ্দিন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ইনকিলাব সহকারী সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ, বিএফইউজে একাংশ সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, ডিইউজের একাংশের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক আশীষ সৈকত, জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, সমকালের প্রধান প্রতিবেদক লোটন একরাম, আমার দেশের বার্তা সম্পাদক জাহিদ চৌধুরী, ল রিপোর্টাস ফোরামরে সভাপতি সাইদ আহমেদ প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন।