উবার-পাঠাওয়ে ভ্যাট প্রত্যাহার করুন: এফবিসিসিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক : উবার-পাঠাওয়ের মতো অ্যাপভিত্তিক গাড়ি ভাড়া থেকে টাকা আদায়ের চিন্তা বাদ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে করা সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানান সংগঠনটির সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন।

বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বাজেটে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবায় পাঁচ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর বাজেটে কোনো কর আরোপের প্রস্তাব হলে সেটা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সেদিনই একটি আদেশ জারি করে এ বিষয়ে।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘বর্তমান যানজটে দ্রুত যাতায়াতের জন্য এ ধরনের সেবার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণপরিবহন বিশেষকরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল প্রভৃতি মেগা প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের পূর্ব পর্যন্ত অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনের রাইড শেয়ারিং সেবাকে মূসকের আওতামুক্ত রাখার প্রস্তাব করছি।’

ঢাকায় গাড়ি ভাড়া করা যখন এক বিড়ম্বনা আর খরচের বিষয় তখন অ্যাপভিত্তিক গাড়ি ভাড়ার সেবাগুলো নগরবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রীর ইচ্ছামতো গন্তব্যে যাওয়া, যাত্রীর পছন্দের জায়গা থেকে তাকে তোলার কারণে দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে এই সেবা।

গাড়ি ছাড়াও মোটরসাইকেলও চলছে অ্যাপে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি যেমন কমেছে, তেমনি গাড়ি বা মোটর সাইকেল চালিয়ে আয়ও করতে পারছে বিপুল সংখ্যক মানুষ।

এই অবস্থায় এসব পরিবহনে ভাড়ার ওপর ভ্যাট আরোপের সমালোচনা হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে ২০টির মতো অ্যাপভিত্তিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল ভাড়ার সেবা চালু আছে ঢাকায়। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় উবার-পাঠাও।

‘অর্থনীতি স্থিতিশীল’

দেশের অর্থনীতি নিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে চলেছে।… দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সামস্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোও ঊর্ধ্বমুখী।

আমাদের অর্থনৈতিক সাফল্য আজ বিশ্ব দরবারে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত।’

ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থন্বেষী মহলের কারণে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের বিশৃংখলা দেখা দিচ্ছে, যা আমাদের পলিসির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’

‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার প্রস্তাব করছি – যাতে করে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বজায় থাকে।’

করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো প্রস্তাব

বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আগের মতোই আড়াই লাখ করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি, জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি বিবেচনায় এটি তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করে এফবিসিসিআই।

পোশাক শিল্পের করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব

প্রস্তাবিত বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য করপোরেট করের হার ১৫ শতাংশ নির্ধারনের ঘোষণা এসেছে। এটা বর্তমানে ১২ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রিণ কারখানার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ শতাংশ, যা বর্তমানে ১০ শতাংশ। এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, কর বাড়ায় শিল্পে পুনঃবিনিয়োগের অর্থের যোগানে স্বল্পতা সৃষ্টি হবে, যা এ শিল্পের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

কর বৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিল করে আগের হার ফিরিয়ে আনার দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে চার লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৩ লক্ষ ৭১ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

বাজেট বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও অর্থব্যয় সঠিকভাবে করতে না পারায় প্রতিবছরই বাজেট সংশোধন করতে হয় জানিয়ে এফবিসিসিআই নেতা বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নে বছরের শুরু থেকেই সুষ্ঠু মনিটরিং জোরদার করা জরুরি।’

‘বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকের মান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।’

ব্যাংক ঋণে নির্ভরশীলতার সমালোচনা

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে ব্যাংক ব্যবস্থা ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এফবিসিসিআই নেতা বলছেন, ‘ব্যাংক খাতের উপর নির্ভরশীলতা উৎপাদনশীল খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে সে বিষয়ে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।’

‘রাজস্ব আদায় চ্যালেঞ্জ হবে’

প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লক্ষ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, যা গত বছরের লক্ষ্যমাত্রার (২ লক্ষ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা) তুলনায় ১৯.৩৪% বেশি।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ের এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’

‘লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে করদাতাদের উপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং আইন-কানুন-এর অপপ্রয়োগ ও কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা ক্ষমতার কারণে ব্যবসায়ীদেরকে হয়রানি করা হয়ে থাকে।’

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং রাজস্ব আয় যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই হারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি বলেও মনে করেন এফবিসিসিআই সভাপতি। বলেন, ‘সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আরও উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।’

আয়করের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা ৩৫ লক্ষ থেকে আগামী ৫ বছরে ৮০ লাখে উন্নীত করতে হলে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে বলে মনে করেন এফবিসিসিআই নেতা।

কর প্রশাসনকে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অটোমেশনসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে অধিক নজর দেয়ার জন্য প্রস্তাব করা হয় সংবাদ সম্লেলনে।

সংবাদসম্মেলনে এফবিসিসিআই সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, সহ-সভাপতি মুনতাকিম আশরাফ এবং সংগঠনের পরিচালকবৃন্দ ও সদস্য সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Inline
Inline