আ.লীগ এমপির বিরুদ্ধে ‘সেভেন স্টার’, বিএনপির দুশ্চিন্তা জামায়াত

রাজশাহী সংবাদদাতা : আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে রাজশাহী-১ আসনের প্রার্থীদের প্রতিযোগিতায় আওয়ামী লীগে দেখা দিয়েছে গৃহদাহ। বর্তমান এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন দলের অন্য সাত মনোনয়ন-প্রত্যাশী। তারা ইতোমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় ‘সেভেন স্টার’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। যেকোনো মূল্যে এমপি ফারুক চৌধুরীকে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে এই আসনে বিএনপির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনহীন দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এখানে মনোনয়ন চাইতে পারেন। এটা এ আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি সরকারের সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

তাছাড়া বিএনপির আরও তিন নেতা অনেক দিন থেকেই এ আসনের প্রার্থী হতে মনোনয়ন চেয়ে আসছেন। তবে এসব নেতার চেয়ে জামায়াতই বড় দুশ্চিন্তার কারণ বিএনপির জন্য।

গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এখান থেকে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির যিনিই এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, তিনিই পেয়েছেন মন্ত্রিত্ব। তাই এ আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতা বরাবরই বেশি থাকে।

আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী ছাড়াও এখানে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মতিউর রহমান, তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মু-ুমালা পৌরসভার মেয়র গোলাম রাব্বানী, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বদরুজ্জামান রবু মিয়া, মকবুল হোসেন, প্রচার সম্পাদক ও গোদাগাড়ী পৌরসভার মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবু, গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম আতাউর রহমান খান এবং জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল ওহাব জেমস।

আর বিএনপির অন্যান্য মনোনয়ন-প্রত্যাশীর মধ্যে রয়েছেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত সচিব জহুরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাবেক যুববিষয়ক সম্পাদক সাজেদুর রহমান খান মার্কনি ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক শাহাদৎ হোসেন শাহিন।

আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের কাছে পরাজিত হন। ২০০৭ সালে ব্যারিস্টার আমিনুল হকের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি আত্মগোপন করেন। ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন ব্যারিস্টার আমিনুল হকের বড় ভাই সাবেক পুলিশ-প্রধান এনামুল হক। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে আওয়ামী লীগের প্রথম দফার মেয়াদকালের শেষ পর্যায়ে শিল্প প্রতিমন্ত্রী হন ওমর ফারুক চৌধুরী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয়বার এমপি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় দফা এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে প্রবীণ নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করা, বিএনপি থেকে আসা নেতাকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া, জামায়াতপ্রীতি ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণসহ নানা অভিযোগ ওঠে। ফলে তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাত নেতা।

এই সাত নেতা বলছেন, তাদের ভেতর থেকে যেকোনো একজনকে দলীয় মনোনয়ন দিলে তারা একজোট হয়ে কাজ করে জয় ছিনিয়ে আনবেন। কিন্তু ওমর ফারুক চৌধুরীর মনোনয়ন তারা মানবেন না। তাদের ভাষ্য, ফারুক চৌধুরী দলের ত্যাগী ও আদর্শবান নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তার আশপাশে এখন বসন্তের কোকিলরা। এ নিয়ে দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মীর রয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

আসছে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন-প্রত্যাশী সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। ওই নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু পাননি। এবার তিনি জোরালোভাবে মাঠে রয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমানের সমর্থকরা বলছেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে তিনি উচ্চ আদালতের নির্দেশে চাকরি ফিরে পান। তার পরিচ্ছন্ন ইমেজ ও নেতাকর্মীদের প্রতি আন্তরিকতার কারণে তারা তাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান।

‘সেভেন স্টারের’ মধ্যে তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং মু-ুমালা পৌরসভার মেয়র গোলাম রাব্বানীও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। আগে এমপি ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ঘনিষ্ঠ দুই নেতা পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ওই সময় থেকেই এমপি ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে মাঠে নামেন গোলাম রাব্বানী। নিজেকে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন।

রাব্বানীর অনুসারীদের দাবি, তার বাবা পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ সহচরও ছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই এ পরিবারটির সদস্যরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণে নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আওয়ামী লীগের দুর্যোগ ও অসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন তিনি। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো রাব্বানীকে এগিয়ে রাখবে বলে তাদের আশা।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন-প্রত্যাশী গোদাগাড়ী পৌরসভার মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবুর অবস্থানও শক্তিশালী। তার সমর্থকদের দাবি, বাবু ছাত্রলীগের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন। এরপর যুবলীগ হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এরপর টানা নয় বছর থেকে গোদাগাড়ী পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। পৌর নির্বাচনে তিনি সাবেক মেয়র জামায়াত নেতা আমিনুল ইসলামকে পরাজিত করেন। আগামী নির্বাচনে জনপ্রিয়তার বিষয়টি মাথায় রেখে বাবুকে মনোনয়ন দেয়া হবে বলে আশা করছেন তার সমর্থকরা।

বিএনপি

১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার এমপি নির্বাচিত বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার আমিনুল হক। দুই দফায় মন্ত্রীও ছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালে গোদাগাড়ী ও তানোর অঞ্চলের রাস্তাঘাট তৈরি করেন। এ ছাড়া তিনি সেসময় এলাকার বেকার যুবকদের পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি দেন। এ কারণে বিএনপি ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তার ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে।

এ ছাড়া গোদাগাড়ী-তানোরে তার বিকল্প কোনো নেতাও এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাঠে রয়েছেন। তাই আসছে নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির এই ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করেন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

তবে আসনটি থেকে জোটগতভাবে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করছেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ও ১৯৮৬ সালে এমপি নির্বাচিত অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। এ নিয়ে কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তায় ব্যারিস্টার আমিনুলের কর্মী-সমর্থকরা। কেননা মুজিবুর রহমানের কেন্দ্রীয়ভাবে শক্ত প্রভাব রয়েছে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের নেতা ছিলেন। অল্প কিছুদিন গোদাগাড়ীর একটি কলেজে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতাও করেন।

আশির দশক থেকে এ জামায়াত নেতা ঢাকায় অবস্থান করছেন। জোটের একটি বড় দলের প্রধান হিসেবে বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। তাই জোটগতভাবে নির্বাচনে মুজিবুর রহমানও মনোনয়ন পেতে পারেন বলে আশা করছেন জামায়াত নেতাকর্মীরা।

Inline
Inline