আসামিদের কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মোট ৫২ আসামির মধ্যে তিন জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে অন্য মামলায়। বাকি ৪৯ জন আসামির মধ্যে কারও বিরুদ্ধে আছে সরাসরি গ্রেনেড হামলা চালানো, কারও বিরুদ্ধে পরিকল্পনা, কারও বিরুদ্ধে গ্রেনেড সরবরাহসহ সহযোগিতা এবং কারও বিরুদ্ধে হামলাকারীদের পালাতে সহযোগিতা এবং কারও বিরুদ্ধে আলামত নষ্ট এবং তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অভিযোগ।

১৪ বছর আগে চালানো এই হামলার রায় হবে ১০ অক্টোবর, এটি ১৮ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে আদালত। প্রকাশ্যে চালানো এই হামলার শুনানি আদালতে চলেছে আট বছর। আর ছয়টি বছর গেছে তদন্ত এবং পুনঃতদন্তে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট দেশ কাঁপানো এই হামলার তদন্ত হয়েছে মোট তিনটি সরকারের আমলে।

প্রথম দুই বছর তদন্ত চলেছে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। তখন মূল হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীদেরকে বাঁচিয়ে নিরীহ হকার জজ মিয়াকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর অধিকতর তদন্ত চলাকালে ধরা পড়ে জজ মিয়াকে আসামি করার বিনিময়ে তার পরিবারকে মাসোহারা দেয়ার বিষয়টি।

২০০৮ সালের ১১ জুন জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিণ্টু, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দেয়া হয়। শুরু হয় বিচার।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর আদালতের নির্দেশে আবার হয় তদন্ত। আর দুই বছর পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই আদালতে জমা পড়ে সে তদন্ত প্রতিবেদন। এতে বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিণ্টু, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউকসহ আরও ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করা হয়।

২০১২ সালের ১৮ মার্চ এই ৩০ জনসহ মোট ৫২ জনের বিরুদ্ধে শুরু হয় বিচার। আর ছয় বছর চলে শুনানি।

সরাসরি হামলায় যারা

২০০৫ সালের ১ অক্টোবর গ্রেপ্তারের পর মুফতি হান্নান টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে মুফতি হান্নান যে জবানবন্দি দিয়েছেন তাতে তিনি হামলাকারী হিসেবে কাজল, জান্দাল, আনিসুল মুরসালিন (ফরিদপুর) ও তাঁর ভাই মহিবুল মুত্তাকিন, মাওলানা আবু বকর (বরিশাল), শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল (নারায়ণগঞ্জ), উজ্জ্বল ওরফে রতন (ঝিনাইদহ), মাসুদ (ঝিনাইদহ), আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল (ঝিনাইদহ), ইকবাল (ঝিনাইদহ), জাহাঙ্গীর আলম (কুষ্টিয়া), মহিবুল ওরফে অভি (গোপালগঞ্জ), রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ (মাগুরা), খলিল (মাগুরা), শুভ ওরফে তৌফিক (নারায়ণগঞ্জ), আরিফ হাসান ওরফে সুমন (ঢাকার মোহাম্মদপুর), বাবু (টাঙ্গাইল), ফেরদৌস (ঢাকার মিরপুর), ও মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ারের (গোপালগঞ্জ)নাম জানান।

এদের নিয়ে বৈঠক করেন মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে জাফর, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর বদর (ঢাকার দোহার), হাফেজ আবু তাহেরসহ আরও কয়েকজন।

পরে আক্রমণের জন্য ১২ জনকে চূড়ান্ত করা হয়। তাঁদের ১৫টি আর্জেস গ্রেনেড দেওয়া হয়। প্রতি দলে চারজন করে তাঁদের তিনটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়।

এর মধ্যে মঞ্চে আক্রমণের দায়িত্ব ছিল জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের সমন্বয়ে গঠিত দলের। তাঁদের অবস্থান ছিল মঞ্চের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে।

সবুজ, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ ও উজ্জ্বলের সমন্বয়ে দ্বিতীয় এবং মুত্তাকিন, মুরসালিন, আরিফ হাসান ও ইকবালের সমন্বয়ে গঠিত তৃতীয় দলটির দায়িত্ব ছিল যথাক্রমে মঞ্চের পশ্চিম ও পশ্চিম-উত্তর দিকে অবস্থান নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত জনতার ওপর আক্রমণ করা।

টিএফআই সেলে দেওয়া জবানবন্দিতে মুফতি হান্নান বলেন, এই ১২ জনের বাইরে আবু বকর, জুয়েল, খলিল, শুভ, বাবু, ফেরদৌসসহ আরও কয়েকজন গোলাপ শাহ মাজারের মসজিদে অবস্থান নেন। এদের মধ্যে ছয়জনকে পাঠিয়েছেন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু।

তারেক রহমান, বাবর, পিণ্টু, হারিছ, মুজাহিদের বৈঠকে হত্যার পরিকল্পনা

২০১১ সালে জমা দেয়া সম্পুরক অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০০৪ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আল মারকাজুল ইসলামীর একটি মাইক্রোবাসে করে হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিন আল যোগে বনানীর হাওয়া ভবনে যান। তাদের সঙ্গে আল মারকাজুলের (এনজিও) কর্মকর্তা আবদুর রশিদও ছিলেন।

তারা তারেক রহমান, বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠকে জঙ্গিরা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের ওপর হামলার বিষয়ে সহযোগিতা চান। বৈঠকে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের তারেক জিয়া সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

হাওয়া ভবনে বৈঠকের পর ১৮ আগস্ট (২০০৪) তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডিতে সরকারি বাসায় মাওলানা আবু তাহের, তাজউদ্দিন ও মুফতি হান্নান বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, পরিবহন-মালিক মো. হানিফ ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ

মামলায় বেশ কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২১ আগস্ট হামলার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্ঞাতসারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের নির্দেশে গ্রেনেড সরবরাহকারী তাজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ কাজে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ওরফে ডিউক (খালেদা জিয়ার ভাগ্নে), তাঁর ভায়রা ভাই ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার ও ডিজিএফআইয়ের তখনকার পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন পরস্পর যোগসাজশে ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর মাওলানা তাজউদ্দিনকে ভিন্ন নামের পাসপোর্টে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেন।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

জোট সরকার আমলের সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, এএসপি আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তারা জজ মিয়াসহ তিনজনকে দিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি আদালতে লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে বলপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, এ টি এম আমিন, সাবেক দুই আইজিপি আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, খান সাঈদ হাসান, ওবায়দুর রহমান খানের বিরুদ্ধে কর্তব্যকাজে অবহেলার জন্য দণ্ডবিধির ২১২ ও ২১৭ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

এ ছাড়া খান সাঈদ ও ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে আলামত ধ্বংস করার অভিযোগ আনা হয়।

সিআইডি কর্মকর্তারা ২০০০ সালে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ও পরের বছর সিলেটে বোমা হামলার মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এই ঘটনায় মুফতি হান্নানের সম্পৃক্ততার কথা জানতে পারেন। কিন্তু খোদা বক্স চৌধুরী, রুহুল আমিন, মুন্সী আতিক ও আবদুর রশিদ তখন মুফতি হান্নানকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেননি। মূল আসামিদের বাঁচাতে তারা না করে পরস্পর যোগসাজশে জজ মিয়াসহ তিনজনের কাছ থেকে বলপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করেন।

সাবেক তিন আইজিপির বিরুদ্ধে অভিযোগ

হামলার সময়কার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহুদুল হক, তৎকালীন মহানগর পুলিশ কমিশনার (পরবর্তী সময়ে আইজিপি) আশরাফুল হুদা, সিআইডির প্রধান (পরবর্তী সময়ে আইজিপি) খোদা বখ্স চৌধুরী, উপকমিশনার (পূর্ব) ওবায়েদুর রহমান খান ও উপকমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো: তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেননি।

এই তিন পুলিশ কর্মকর্তা তারা আসামিদের আক্রমণ পরিচালনার সুবিধায় ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের ওই সমাবেশ ও র‌্যালির জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেননি। ঘটনায় ব্যবহৃত অবিস্ফোরিত তাজা গ্রেনেড আলামত হিসেবে জব্দ করার পরও, তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। আদালতের অনুমতি ছাড়াই উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেনাবাহিনীকে দিয়ে গ্রেনেড ধ্বংস করে আলামত নষ্ট করেছে।

এদের কেউ কেউ ওই হামলার ঘটনা আগে থেকে জানতেন। তাই হামলার পরপর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ফলে আক্রমণকারী জঙ্গিরা সহজে পালাতে সক্ষম হয়।