আমার স্মৃতিপটে বেনুদা

আব্দুল আজিজ তকি : বেনুদা ( ডাঃ বি বি চৌধুরী) ২০১৬ সালের মে মাসের ১লা তারিখ ইহদাম ত্যাগ করলেন । খবরটা আকস্মিক। বাশার ভাই (সৈয়দ আবুল বাশার) টেলিফোনে খবরটি আমাকে পৌছালেন। হঠাৎ এ খবরে বুকটা হল ভারি, মনটা বিষন্ন আর হৃদয়টা ব্যথিত। ভাবতে বড় কষ্ট লাগে- এ জনমে আর কখনো বেনুদার সাথে দেখা হবে না। জানতাম ৮৫ বছরের বয়সী এই প্রাণচঞ্চল মানুষটি যে কোন সময় চোখ বুজবে। তবে একেবারেই যে অদেখায়, অজানায় চুপ করে চলে যাবে এমনটি কখনো স্মরনেও আসেনি। কাজী ভাই (খলিল কাজী) দাদাকে বার বার বয়সের কথা স্মরণ করিয়ে সতর্ক করতেন কিন্তু দাদা কাজী ভাইয়ের সব কথা শুনলেও এ কথাটি মোটেই আমলে নিতেন না। জীবন মৃত্যু সম্পর্কে তার ধারনা ছিল অন্য রকম। তিনি বলতেন ‘আমি সর্বদা সুস্থ আছি, যোগ ব্যায়াম করি, আমার কিছুই হবে না।’ দাদার এমন একটা বিশ্বাসের ভিত ভেঙে গেল। বড় কষ্ট পেলাম। ইদানিংকালের একজন লেখক ঈযৎরং খঁসঢ়শরহ বলেছেন- “ডযবহ ধ পষড়ংব ভৎরবহফ ঁহবীঢ়বপঃবফষু ষবধাব ঁং, ধ ঢ়রবপব ড়ভ যবধৎঃ রং ভড়ৎবাবৎ নৎড়শবহ” (যখন কাছের কোন সুজন অপ্রত্যাশিত ভাবে আমাদের ছেড়ে যায়, হৃদয়ের একটি টুকরো চিরদিনের জন্য ভেঙে পড়ে)। বেনুদাকে হারানোর ব্যথা বেদনায় আমার হৃদয়টাও যেন ভেঙে পড়েছে। বার বার ওর চোখ, মুখ, চেহারা ছবি স্মৃতিপটে ভাসছে।

নব্বই এর দশক থেকে বেনুদার সাথে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় ও চলাফেরা। এই অল্প সময়ের পরিচয় যে কত নিবিড়. কত বিমলিন ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বাঙালি কমিউনিটিতে অতি পরিচিত, অতি শ্রদ্ধাভাজন এবং ্আপনজন এই ডাক্তার বাবু দেশপ্রেম, মানবপ্রেম আর জগতপ্রেমে ছিলেন এমনি নিমজ্জিত যে মৃত্যু কি জিনিস সে সম্পর্কে কোন চিন্তা ছিলনা তার। ডাক্তার হয়ে পাকিস্তান আর্মিতে যোগ দেন বেনুদা। তারপর লন্ডনে আসেন এবং এখানে ছিল স্থায়ী বসবাস। পূর্ব লন্ডনে কয়েক যুগ ডাক্তারি করে অবসর নিলেন অনেক আগে কিন্তু সেটা মাত্র ডাক্তারি অবসর। কমিউনিটিতে হলেন আরো বেশী উদ্দীপ্ত কর্মী। কয়েক হাজার বাঙালি রোগীর চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে তা’দের পারিবারিক ও পরিপার্শি¦ক বিষয়-আসায় জানার সুযোগ হয়েছে তাঁর। যে কারনে নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন সেচ্ছাসেবকের ভূমিকায়। সুতরাং বাঙালি কমিউনিটির সকল সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনায় বেনুদা থাকতেন প্রথম সারিতে। সামাজিক কাজ করতে গিয়ে বুড়ো বয়সেও বর্ণবাদীর আক্রমনে হয়েছন আক্রান্ত। তারপরও সমাজ সেবা থেকে হাত গুটিয়ে নেননি এই মানুষটি। যখন যেখানে ডাক পড়েছে সেখানেই দেখা গেছে সোচ্চার। প্রয়োজনে টাকা পয়সা খরচেও ছিলেন পুরোধা।

দেশে বিদেশে বেনুদার রয়েছে প্রচুর জনহিতকর কাজ। কলকাতার গুষ্টিতলার লাইব্রেরী, বান্দরবনের তমরুতে পাহাড়ি বাচ্চাদের লেখাপড়ার স্কুল, বৌদ্ধ মন্দিরে পাঠশালা ঘর আর কতকিছু। মরার সময়ও গাজীপুরে হাসপাতাল নির্মানে ছিলেন ব্যস্ত। মনে পড়ে কয়েকবছর আগে আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম বিশ্ববাঙালিদের নিয়ে একটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরীর। এতুদ্দেশ্যে ২০১২ সালের ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিত হল প্রথম বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন। বেনুদা সেখানেও ছিলেন অগ্রগন্য সৈনিক। এই সম্মেলনে আসলেন নোবেল বিজয়ি অমর্ত্য সেন। সম্মেলন উদ্বোধনে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমরা নিতে চাইলাম। প্রধান মন্ত্রী সময় দিতে পারছেন না। বেনুদা সহ আরো কয়েকজন দেখা করতে গেলেন। সকলেই বাইরে অপেক্ষমান। হঠাৎ প্রধান মন্ত্রীর চোখ পড়লো দাদার উপর। “আপনি এখানে বসে আছেন কেন” বলে প্রধানমন্ত্রী বেনুদার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেলেন। আসলে লন্ডনে অবস্থান কালে শেখ হাসিনার ডাক্তার ছিলেন বেনুদা।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেনুদা আমাদের প্রথম বিশ্ববাঙালি সম্মেলনের কথা উঠালেন । অনুষ্ঠানটি উদ্বোধনের আমন্ত্রন জানালেন। এতদিন “পারবেন না” বলে প্রধান মন্ত্রীর কাছ থেকে জবাব আসছিল। এইবার দাদা ধরে বসলেন। বল্লেন-‘বিশ্বের বাঙালিরা আসছে, আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতির কর্ণধার। মা আর মাটির টানেই মানুষ আসছে দূর দূরান্ত থেকে। এখন আপনিই এদেশের মা, আপনাকেই আমাদের সম্মেলনটি উদ্বোধন করতে হবে।” এক কথায় কাজ হয়ে গেল। বেনুদার কথাশুনে প্রধানমন্ত্রী রাজি না হয়ে পারলেন না। বেনুদার প্রতি পূর্ণ সন্মান দেখালেন হাসিনা। সাহস করে এমন একটি কথা বলার আর কয়জন লোক আমাদের আছে? এমন একটা অপূর্ণতা কি আর পুষানো যাবে?

বেনুদাকে সাথে নিয়ে বহু ঘুরেছি। আমরা কানাডার টরেন্টো, মন্ট্রিল, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, স্পেনের বার্সিলোনা, মাদ্রিদ, ফ্রান্সের প্যারিস, ভারতের কলকাতা, বাংলাদেশের ঢাকা, চট্রগ্রামের বান্দর বন, তমরু ইত্যাদি। তাঁর চট্রগ্রামের বাসায় থেকেছি, খেয়েছি। তেমনি কলকাতার বাসায়। বয়সের তারতম্য আকাশ পাতাল। তারপরও বেনুদা আমাকে ‘তকি সাব’ বলে ডাকতেন। আমার যাতে কষ্ট না হয় সেদিকে শত পার্সেন্ট খেয়াল রাখতেন। চেন্নাই পন্ডিচারিতে একটা সম্মেলনে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফ্লাই করে কলকাতা আসছি। খবর পেয়েই দাদা এয়ারপোর্টে অপেক্ষমান। আমি ভাবতেও পারিনি বেনুদাকে এয়ারপোর্টে পাব। নিয়ে গেলেন তাঁর কলকাতার বাসায়। মাটিতে বিছানা করে নিজে শুয়ে পড়লেন আর আমাকে রাখলেন পালংয়ের উপরে।

বেনুদাকে নিয়ে সারাদিন লেখা যায়। তার কীর্তি কলাপ এত বেশী যা সহজে বলা সহজ নয় আর একটা ছোট্ট পরিসরেও প্রকাশ করা কঠিন। তাঁর পান্ডিত্ব নিয়ে কিছু বলতে চাইনা তবে তিনি প্রচুর পড়াশোনা করতেন। হাতের কাছে যা পেতেন তাই পড়তেন। কথা বল্লেই বুঝা যেত পেটে মাল আছে। অত্যন্ত মেধাবী, সাহসী, রসিক ও আবেগপ্রবন লোক। ভাল লোকদের সম্মান শ্রদ্ধা করতেন বেনুদা। তাঁর যে গুনটি আমাকে মুগ্ধ করতো সেটা তার নিরলসতা। অসম্ভব পরিশ্রমী। এমন বয়সেও প্রতিদিন প্রতিটা ক্ষণ ঘুরে বেড়াতে পারতেন। সকালে ঢাকা, রাতের বাস ধরে পরের দিন চিটাগাং, আবার রাতের বাসে। পরেরদিন কলকাতা। আবার ঢাকা। পরের দিন লন্ডন। বসে থাকতেন না। তার সাথে চলতে গিয়ে আমি মাঝে মধ্যে হাফিয়ে যেতাম। তাঁর সাথে পাল্লাদিয়ে চলা সত্যি কঠিন। সব সময় বলতেন “দিনে কাজ রাতে বাস”।

বেনুদার দু’টি ব্যাপার খুবই লক্ষনীয়। প্রথমতঃ যানবাহনে ঘুম আর দ্বিতীয়তঃ রাস্তার দোকান পাট থেকে খাবারও কিনে খাওয়া। রাস্তার পার্শ্বে দাড়িয়ে যারা ফলমূল, শশা, গাজর, পেয়ারা, নারিকেল, কামরাঙা ইত্যাদি বিক্রি করে তাদের কাছ থেকে যা ইচ্ছে কিনে নিতেন। কলকাতার রাস্তা থেকে আমরা একসাথে আমড়া পর্যন্ত কিনে খেয়েছি। আমি অনেক সময় এগুলো সাহস করে খেতাম না। না জানি পেটে সহ্য হয় কিনা। কিন্তু বেনুদা অনায়াসে চিবুতেন আর গিলতেন। প্রথম প্রথম ইতস্তত করতাম। পরে বেনুদাকে অনুসরণ করে অভ্যাস বদলে ফেলেছি। তিনি বলতেন- “মন যা চায় তাই খাবেন কোন ক্ষতি করবেনা”। আশ্চর্য ! একজন ডাক্তারের মুখে এমন একটা থিওরী যার নাম গন্ধ কোন বই পুস্তকে নেই। আমিও এখন মন যা চায় তাই খেয়ে নেই। এখন পর্যন্ত পেটের ঝামেলায় পড়ি নাই।

এ’গুলোই আজ স্মৃতি, মনের পর্দায় ভাসছে। হাজার বছর আগে রোমান দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ গধৎপঁং ঞঁষষরঁং ঈরপবৎড় বলেছিলেন “ ঞযব ষরভব ড়ভ ঃযব ফবধফ রং ঢ়ষধপবফ রহ ঃযব সবসড়ৎু ড়ভ ঃযব ষরারহম. ( মৃতদের জীবনী জীবিতদের স্মৃতিগাথা)। বেনুদার সকল আশা আকাংখার সমাপ্তি ঘটেছে। তিনি চলে গেলেন পরপারে। আমরা হারালাম একজন কর্মতৎপর সমাজকর্মীকে। বিচিত্র জীবনবাহী এই মানুষটিকে আর কোথাও দেখা যবেনা । তাঁর জীবন কাহিনী আমার স্মৃতিতে চিরকাল উজ্জল, অমলিন ও চির ভাস্বর।(৪ মে ২০১৬)