“আমার সোনার বাংলা”

“আমার সোনার বাংলা”
– রিমন আহমেদ সীমান্ত

আজ নবীনদের বরন করার লক্ষ্যে কলেজে ঘটা করে আয়োজন করা হয়েছে।
ইচ্ছের পক্ষেই সবাই নিজেকে আজ ভিন্ন সাজে মেলে ধরেছে।
অধ্যক্ষ মশাই সহ সকল শিক্ষকমণ্ডলী ব্যস্ততার মানচিত্র আওরাচ্ছেন।
পর্দা উঠতেই মঞ্চসজ্জায় চোখ কপালে উঠলো।
ধর্মীয় তেলাওয়াত দিয়ে মঞ্চ জীবিত হলো।
তারপর সাংস্কৃতিক গান, কবিতা, নাচ একেক করে অনুষ্ঠানে প্রাণের সঞ্চার ঘটালো।

অতঃপর লাল আঁচলের গাঢ় সবুজ শাড়ী পরিহিতা লাল চুড়িময় হাতে কিছু কাগজ ও একটি জাতীয় পতাকা নিয়ে মঞ্চে পদার্পণ করলো অসম্ভব সুন্দরী এক তরুণী।
তরুণীর চুলগুলো যেন বৃদ্ধ হয়ে হাটু ছুঁই ছুঁই করছে।
মেহেরুন কবির মিম।
হাতের কাগজগুলো উঁচিয়ে তাতে চোখ রাখলো।
আমরা মনোযোগ দিলাম তরুণীর কণ্ঠে। তরুনী কিছু বলতে প্রস্তুত।
তারপর তার কথা গুলো তার মত করেই তুলে ধরলাম……………

“আমার বাবা, প্রয়াত সাফায়েত কবির সাহেব।
তার শূন্যতা আমার মস্তিষ্কে বাসা বেধেছে সেই পঞ্চম শ্রেণী থেকেই।
আমি পঞ্চম শ্রেণীতে আর ছোট ভাইটা পড়তো তৃতীয় শ্রেণীতে।
পরিবারে বাবা, মা, ছোট একটা ভাই আর আমি।
খুব স্বতঃস্ফূর্ত আর স্বচ্ছল সুখি পরিবার ছিল আমার পরিবার।
বাবা ছিলেন সরকারী কর্মকর্তা। মুক্তিযোদ্ধার একটি অকেজো গুন পোকায় মেরে ফেলা সার্টিফিকেটও আছে বাবার।
বাবা নাকি সৎ অফিসার ছিলেন।
কথাটা আমার মা অসংখ্যবার অযথাই আমাকে বলতেন।
আমি বলতাম, ‘মা, তোমার বাড়িয়ে বলার স্বভাবটা মাঝে মাঝে বিরক্ত করে আমাকে ’
মা তখন বলতেন, ‘এখন তুই বুঝবি না মিম,বড় হলে তখন বুঝবি ’।
বাবা সৎ ছিলেন তা বুঝতে আমাকে অনেক বেশি বড় হতে হয়নি।
মায়ের গলা উচু করে বাড়িয়ে বলা বাক্যটা এখন আমি মনেপ্রাণেই বিশ্বাস করি।
বাবা সৎ ছিলেন আর সেটা তাকে প্রাণ দিয়েই প্রমাণ করতে হয়েছিলো।
যতটুকু মনে পড়ে বাবা কখনই কোন চাওয়া অপূর্ণ রাখেনি।
অপরিমাপযোগ্য ভালোবাসার বেষ্টনীর মোড়কে মুড়িয়ে রাখতো বাবা আমাকে।
আমি কিছু চেয়েছি আর বাবা সেটা এনে দেয়নি এমন কখনই হয়নি।
সব পেয়েছিলাম লোকটার কাছ থেকে।
কিন্তু একটি চাওয়া আজও পাওয়ার কষ্টে কেঁদে মরে।
একটি জাতীয় পতাকা, একটা জাতির পরিচয়ের বাহন।
সেই অপূর্ণতাকে যাঁতাকলে পিষে পূরণ করে গিয়েছিলো ভরা বুকটাকে শূন্যতার হাহাকারে নিক্ষেপ করে।
এনে দিয়েছিলো নরক যন্ত্রণা, একটি লাল রক্তে রঞ্জিত পবিত্র পতাকা।

বাবার ঘুমের ঔষধ ছিলো আমার কণ্ঠে জাতীয় সংগীত।
বাবা প্রতিদিন জাতীয় সংগীত শুনে ঘুমুতে যেতেন।
জাতীয় সংগীত না শুনলে তার ঘুম আসতো না।
একবার আমি নানীবাড়ী বেড়াতে গেলাম।
বাবা অফিস থেকে বাসায় এসে আমাকে না দেখে রেগেমেগে রাতে গিয়ে আমাকে সেখান থেকে বাসায় নিয়ে আসলেন।
বাবা বললেন, ‘তুই জানিস না রাতে ঘুমাতে পারবো না?’

অনেক দিন হলো বাবার কাছে একটা জাতীয় পতাকা চাইছি।
কিন্তু বাবা দিবো দিবো করে ভুলে যান।
প্রতিদিন নানান ওজুহাত দেখায় আর আমার মন খারাপ হয়।

কাল ১৬ ডিসেম্বর।
আমি বাবাকে বললাম, ‘বাবা আজ যেন ভুলে যেও না’
বাবা অপরাধীর হাসি হেসে বললেন, ‘কাল বিজয় দিবস, আজ ভুল হলে সারারাত কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবো’।
আমি হেসেই দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।
আমি জানি বাবা আজও পতাকা আনতে ভুলে যাবে।

বাবা বিকেলের মধ্যেই অফিস সেরে বাসায় ফিরে আসেন, কিন্তু আজ সন্ধ্যা পেরিয়ে যাচ্ছে তবুও বাবা বাসায় আসছে না।
সবার চিন্তার অবসান ঘটিয়ে বাবা ফিরলেন রাত ৯ টায়।
জানালেন অফিসে নাকি অনেক কাজ ছিলো।
আমি দৌড়ে বাবার কাছে গিয়ে বললাম, ‘বাবা আমার পতাকাটা দাও,আমি দেখবো’
বাবা অপরাধীর মত জানালেন সে আনতে ভুলে গেছেন।
আমি আজ জাতীয় সংগীত শুনাবো না সাফ জানিয়ে দিলাম।
বাবা পরলেন বিপাকে।
রাত ১০ টায় বের হলেন পতাকা খুঁজতে। ১২ টা বেজে যাচ্ছে অথচ বাবা বাড়ী ফিরছেন না।
১২ টা ৪৫ মিনিটে বাহিরে থেকে “মিম” ডাকের আওয়াজ এলো।
আমরা তড়িঘড়ি করে বাহিরে গিয়ে দেখি বাবা উঠোনে রক্ত জর্জরিত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পরে আছে।
বাবার হাতে রক্তেমাখা একটি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছি।
মাও পাগলের মত কাঁদছে আর মাটি চাপড়াচ্ছে।

বাবা আমাকে বললেন ‘মা কাঁদিস না, এই নে তোর পতাকা,এবার আমাকে জাতীয় সংগীতটা শুনা। আমি আজ চিরতরে ঘুমাবো। তোর মুখে জাতীয় সংগীত না শুনে যে আমি মরেও শান্তি পাবোনা ’

আমি কাঁদতে কাঁদতে বাবার বুকে শুয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করলাম। পাশে বসে মা অবুঝের মত কাঁদছে। জাতীয় সংগীত গাইতে গাইতে বাবা যে কখন পালিয়ে গিয়েছিলো আমি বুঝতেই পারিনি।
জাতীয় সংগীত শেষে বাবার বুক থেকে মাথা উঠিয়ে দেখি বাবা ঘুমিয়ে গেছে। প্রতিদিনও তাই হতো।
জাতীয় সংগীত শুনতে শুনতে বাবা ঘুমিয়ে যেত।
আজ ও গেলো।
কিন্তু এই ঘুম আর কখনই ভাঙবে না, কখনই ভোর দেখবে না। ”

পুরো অডিটোরিয়াম নিশ্চুপ, সবার চোখে পানি পড়ি পড়ি করছে, মিম মঞ্চে দাড়িয়ে পতাকায় মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।
একজন দাঁড়িয়ে বললো, ‘আমরা সবাই শুনতে চাই সেই জাতীয় সংগীত, যেই সংগীত শুনে বাবা মরেও শান্তি পায় ’

মিম কান্না থামিয়ে মুখ উচু করে তাকালো।
সারা অডিটোরিয়াম এক সুরে বলে উঠলো, ‘শুনবো, আমরাও শুনবো সেই জাতীয় সংগীত’
মিম চোখ মুছতে মুছতে জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করলো।
আমরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম।
মিমের সাথে আমরাও গাইতে শুরু করলাম।
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস আমার প্রানে বাঁজায় বাঁশি”।