আপনিই উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন: প্রধানমন্ত্রীকে রিজভী

নিজস্ব সংবাদদাতা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন’ বলে মনে করছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ১৯৮১ সালে তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করার বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে এ কথা বলেন বিএনপি নেতা।

বুধবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পরদিন নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন রিজভী।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে দুটি মামলায় দণ্ডিত এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক মামলার কথা তুলে ধরে বিদেশে পলাতক তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করায় বিএনপির সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, বিএনপিতে কি একজনক নেতা ছিলেন না যে একজন দণ্ডিত, পলাতক আসামিকে দলের নেতা বানাতে হবে?

এর জবাবে সেদিনই বিএনপির মহাসচিব এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তারেক রহমান যোগ্য বলেই তাকে নেতা বানানো হয়েছে।

বুধবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পরদিন নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে রিজভীও এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি করার বিষয়টি তুলে ধরেন বিএনপি নেতা। বলেন, ‘আপনি ৮১ সালে দলের সভাপতি কীভাবে এবং কোন দেশে থেকে হয়েছিলেন সেটা কি আপনার মনে আছে?’

‘তখন আওয়ামী লীগে অনেক বর্ষীয়ান নেতা ছিলেন, তাদেরকে ডিঙ্গিয়ে আপনি কীভাবে দলের সভাপতি হয়েছিলেন? আপনি তো আওয়ামী লীগের সদস্যও ছিলেন না।’

‘আপনি কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকেই সরাসরি আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন’-বলেন রিজভী।

‘প্রধানমন্ত্রী আয়নার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন না, এটাই তার সমস্যা’- এমন কথা বলে তারেক রহমান কীভাবে নেতা হয়েছেন, সেটি তুলে ধরেন রিজভী। বলেন, ‘দলে ধাপে ধাপে সদস্য, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং পরে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন। তিনি ধারাবাহিকভাবেই জাতীয় রাজনীতির আজকের অবস্থানে উন্নীত হয়েছেন।’

‘আপনার এবং আপনার আন্দোলনের ফসলদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেও জনাব তারেক রহমান নিজস্ব আদর্শে অটল থেকে জনগণের মধ্যে যে আস্থার জায়গাটি পেয়েছেন সেজন্যই প্রধানমন্ত্রীর অত্যুগ্র হিংসা জনাব তারেক রহমানের দিকে ধেয়ে আসে।’

প্রধানমন্ত্রীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারত

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো ‘স্বাভাবিকভাবে’ চললে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারত বলে মনে করেন রুহুল কবির রিজভী।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দাবি, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ক্ষমতার জোরে এই মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনকে তিনি ২০১৪, ১৫ ও ১৬ সাল রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার করতে পারতেন। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। তার বিরুদ্ধে মামলাও সরকার দেয়নি, সাজাও সরকার দেয়নি। এটা আদালতের বিষয়। তার মুক্তির জন্য সরকারের কাছে দাবি না করে আদালতে ‘ফাইটব্যাক’ (পাল্টা লড়াই) করতে হবে।

যে মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে, সেই মামলাটি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। মামলা করার প্রায় ১০ বছর পর সাজা ঘোষণা হয়েছে এই মামলায়।

ওই সময় খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু মামলা করেছিল দুদক। তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলাগুলো উচ্চ আদালতে নাচক হয়ে গেছে। আর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাগুলো বেশ কয়েক বছর স্থগিত থাকলেও এখন সেগুলো সচল হয়েছে।

রিজভী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যখন দায়িত্ব নেন তখন তার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা ছিল। স্বাভাবিক গতিতে মামলা চললে উনার যাবজ্জীবন দণ্ড হতে পারত। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার জোরে মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।’

রিজভী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলছেন, খালেদা জিয়ার সাজা আদালতের ব্যাপার। কিন্তু আদালত নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিহিংসার রায় এটি।’

খালেদাকে ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না

প্রধানমন্ত্রী তার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কোনো দল নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, এটা সেই দলের একান্ত নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়। তিনি কাউকে নির্বাচনে আসতে জোর করতে পারেন না।

এর জবাবে রিজভী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যতই মহাপরিকল্পনা করুক, বিএনপি এবং খালেদা জিয়া ছাড়া দেশে কোন নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।’

বিএনপি নেতা বলেন, সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিকারগ্রস্ত মনেরই বহিঃপ্রকাশ। এটা স্বৈরশাসকের কণ্ঠস্বর। কারণ, স্বৈরশাসকরা জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, কারণে অকারণে জ্ঞান দেয়। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটাই করেছেন।’

‘তার গতকালের সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য হিংসায়-প্রতিহিংসায় আকণ্ঠ আপ্লুত।’

‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার যেভাবে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে সেটির পুনরাবৃত্তির দিবাস্বপ্ন আওয়ামী নেতারা দেখতে পারেন, কিন্ত এদেশে আর একতরফা জাতীয় নির্বাচন হবে না। তাই শেখ হাসিনা যতই মহাপরিকল্পনা করুন না কেন, সেই নীলনকশার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারবেন না।’

সড়ক নিয়ে জনসচেতনতার বক্তব্য ‘তামাশা’

সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পথচারী ও যাত্রীদের সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন। যেখান সেখান দিয়ে রাস্তা পার হওয়া, সিটবেল্ট না বাঁধা, হেলমেট পরিবহনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে গণমাধ্যমের সহায়তাও চেয়েছেন।

তবে রিজভী প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘জনগণকে নিয়ে তামাশা’ বলেছেন। বলেন, ‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন-যারা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় তারাই এর জন্য দায়ী। কেবলমাত্র জবাবদিহিহীন সরকার প্রধানের পক্ষেই এমন কথা বলা সম্ভব। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় এমন সরকার প্রধানের পক্ষেই এ ধরণের বক্তব্য মানায়।’

‘কোটা নিয়ে বক্তব্য জিঘাংসা’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল কোনো ধরনের ক্ষোভ থেকে করেননি তিনি। নাতির বয়সী ছাত্ররা যেহেতু দাবি করেছেন, তিনি মেনে নিয়েছেন। আর এটা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার সুযোগ নেই।

তবে এই আন্দোলন যুক্তিযুক্ত ছিল বলে মনে করেন না। আর এই দাবিতে আন্দোলনকারীরা চাকরি পান কি না, সেটা তিনি দেখতে চান। বলেন, তাদের ছবি সংরক্ষণ করা আছে। তারা এসে পরে যদি কান্নাকাটি করে তখন কিছু করার থাকবে না।

রিজভী এই বক্তব্যকে প্রধানমন্ত্রীর হিংসা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘এ জাতির জন্য লজ্জা এই যে, তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিও প্রধানমন্ত্রীর জিঘাংসা কত তীব্র হতে পারে।’