আত্মহননকারী নারীদের প্রতি ১০ জনের চারজনই ভারতের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্বে প্রতিবছর যত নারী আত্মহত্যা করেন, তার প্রতি দশজনের মধ্যে চারজনই ভারতীয় নারী। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী সব আত্মহত্যার প্রায় ২৪ শতাংশ ভারতীয় পুরুষ। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য জার্নাল ল্যান্সেটে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

ভারত সরকার এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে ল্যান্সেট বলছে, ১৯৯০ সালে পৃথিবীর সব আত্মহত্যার প্রায় ২৫ শতাংশই করেছিলেন ভারতীয় নারীরা। আর ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৬.৬ শতাংশ।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতে যত নারী আত্মহত্যা করেন- তাদের ৭১ শতাংশেরও বেশীর বয়স ১৫ থেকে ৪০ এর মধ্যে।

বিশ্বের আত্মহননকারীদের মধ্যে ভারতীয় নারীদের সংখ্যা কেন এত বেশী? এ বিষয়ে কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের শিক্ষক শৌভিক মন্ডল বলেন, ‘আত্মহত্যার এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে ভারতীয় নারীদের অগ্রগতি যে গতিতে হচ্ছে সামাজিক পরিকাঠামোর উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে, অন্যান্য দেশে উন্নতিটা আরও দ্রুত হচ্ছে’।

আত্মহত্যার সমাজতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করা শৌভিক মন্ডল বলেন, ‘আমরা সবসময়ে জেন্ডার সেন্সিটিভিটির কথা বলি, বা অর্থনৈতিক দিক থেকে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ নিয়ে আলোচনা হয় আবার অন্যদিকে বলা হয়ে থাকে যে ভারতের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। এর একটা সুফল নারীরা পাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু অন্য দেশের নারী-পুরুষদের ভেদাভেদগুলো যত দ্রুত কমছে, আমাদের দেশে সেই গতিতে কমছে না’।

ভারত সরকারের সংগৃহীত যে তথ্যের ওপরে ভিত্তি করে ল্যান্সেট এই রিপোর্ট বানিয়েছে, সেখানে রাজ্যওয়ারি আত্মহত্যার ঘটনার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ওই সমীক্ষায় দেখা গেছে বেশ কয়েকটি রাজ্যে যেমন নারী-পুরুষের আত্মহত্যার হার প্রায় সমান, তেমনই আবার ছত্তিশগড় এবং কেরালায় পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশী।

এ বিষয়ে ভারতের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অনুত্তমা ব্যানার্জী বলেন, ‘এই পরিসংখ্যানে খুব একটা আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আমরা যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাস করি, তাতে নারীদের প্রতিটা ক্ষেত্রেই ব্যাপক চাপের মধ্যে থাকতে হয়- পরিবার হোক, সামাজিক হোক বা কর্মক্ষেত্র হোক। সেই চাপ অনেকেই নিতে পারছেন না। আসলে নারীরা দশভূজা হয়ে উঠে সব দিক সামলিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা করেন, সমাজের কাছে পরিবারের কাছে ভাল হয়ে ওঠার জন্য, তার ফলে তার নিজের ওপরে যে চাপ পড়ে তার দিকে খেয়াল রাখেন না নারীরা’।

আত্মহননের চিন্তাভাবনা করছেন এমন সঙ্কেতগুলোকে হয়তো পাত্তাই দেওয়া হয় না, তাই মানসিক রোগের চিকিৎসা করাও হয় না বেশীরভাগ নারীদের।

অনুত্তমা ব্যানার্জী বলেন, ‘আসলে কোনও কিছুর ওপরেই তো নারীদের অধিকার সমাজ স্বীকার করে না, তাই যেটার ওপরে একজন নারীর অধিকার রয়েছে- নিজের জীবন- সেখানেই নিজের সেই অধিকারটা প্রয়োগ করেন তিনি প্রবল চাপের মুখে পড়ে’।

তবে বিশ্বের হিসাবে ভারতীয় নারীদের আত্মহননের সংখ্যাটা বিপুল হলেও ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ভারতীয় নারীদের আত্মহত্যার হার প্রায় ২৭ শতাংশ কমেছে।

ল্যান্সেটের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অন্য একটি মাপকাঠিতে, যাকে বলা হয় age-standardized suicide rate, সেটা অনুযায়ী ভারতীয় নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা কমেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যায় প্রায় ২৮ জন আত্মহনন করেছিলেন, সেখানে ২০১৬ সালে সেটা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ তে।

ল্যান্সেট বলছে এত বেশী সংখ্যায় আত্মহত্যা করছেন যে দেশের নারীরা, তার জন্য প্রয়োজন আত্মহত্যা-রোধকারী একটি কার্যক্রম। সূত্র: বিবিসি