‘অশুভ শক্তি’ যেন আর আসতে না পারে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব সংবাদদাতা : ধর্মীয় আবরণে নববর্ষ উদযাপনে বিএনপির বাধা দেয়ার ইতিহাস তুলে ধরে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবিরোধী ‘অশুভ শক্তি’ যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে জন্য ঐক্যবদ্ধ থাকার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলা নববর্ষে গণভবনে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ তাগাদা দেন। এ সময় ১৪০০ সাল উদযাপনে সে সময় ক্ষমতাসীন বিএনপির বাঁধার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।

এবার শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের নিজ এলাকায় এবং স্বজনদের সঙ্গে নববর্ষ উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন।  তাই গণভবনে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান তিনি সীমিত করেছেন। আর ঢাকায় থাকা নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষ গণভবনে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান যোগ দেয়। তাদের জন্য বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী নানা খাবারে আপ্যায়িতও করা হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি নববর্ষে এটুকুই চাই, আমাদের দেশে যেন কখনও কোনো ধরনের অশুভ শক্তি না আসে যারা আমাদের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত করবে, ভাষার ওপর আঘাত করবে, সংস্কৃতির ওপর আঘাত করবে, আমাদের নিজেদের কৃষ্টির ওপর আঘাত করবে।’

‘এই ধরনের অশুভ শক্তি যেন আর কোনোদিন বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে সে দিকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

১৪০০ সাল উদযাপনে বিএনপির বাধা

১৯৯৩ সালে ১৪০০ সাল উদযাপনে সে সময়ের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বাঁধা দানের বিষয়টি তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

বাঙালিত্বে বাঁধা ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরই শুরু হয়েছিল বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘কেবল বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই ধ্বংস করা হয়নি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা পরাজিত শক্তির আদর্শেই দেশকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৯৩ সালে আমরা যখন ১৪০০ সালে পদার্পণ করব, আমরা নতুন শতাব্দীকে বরণ করার জন্য একটা কর্মসূচি ঘোষণা দেই, এবং আমরা একটা জাতীয় কমিটি গঠন করি। কবি সুফিয়া কামালকে প্রধান করে নতুন শতাব্দীকে বরণ করতে আমরা একটা অনুষ্ঠানসূচি দেই।’

‘সেই সময় ক্ষমতায় ছিল খালেদা জিয়া, বিএনপি। বিএনপি আমাদেরকে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে তো দেবেই না, এমনকি নতুন শতাব্দীতে যে আমরা পদার্পণ করতে যাচ্ছি, সেটাও উদযাপন করতে দেবে না।’

‘তারা ব্যাপকভাবে আমাদেরকে বাধা দিল। বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য তারা একটা ধর্মীয় আবরণ দেয়ার চেষ্টা করল।’

‘১৩০০ সাল পার হয়ে আমরা ১৪০০ সালে পদার্পণ করব, সেখানে যে এটি পালনে বাধা আসবে, সেটা আমরা ভাবতেই পরিনি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমাদের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। কিন্তু খালেদা জিয়া নির্দেশ দিয়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমরা ঢুকতে পারব না।’

তবে বিএনপি সরকারের বাধা উপেক্ষা করেই সে সময় নববর্ষ উদযাপন হয়েছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘বাঙালি তো বাঁধা মানে না। বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে আমরা জানি। সে সময় আমরা বেগম সুফিয়া কামলাকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে নববর্ষ উদযাপন করেছিলাম এবং নতুন শতাব্দীকে আমরা বরণ করে নিতে পেরেছিলাম।’

‘কেন বাঙালিত্বে আপত্তি, তা বুঝতেই পারেন’

‘বাংলাদেশ একটা ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি, বাংলা ভাষায় চিন্তা করি, বাংলা ভাষায় আমরা হাসি, বাংলা ভাষায় আমরা কাঁদি, বাংলা ভাষায় আমরা জীবন যাপন করি। এখানে কেন তাদের আপত্তি ছিল সেটা আপনারা বুঝতেই পারেন।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার অংশবিশেষ ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ কৌতুহল ভরি’ আবৃত্তি করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তখন যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা না রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাষা বুঝত, না নজরুলের কবিতার ভাষা বুঝত। বুঝত বাধা দিতে হবে, কারণ তাদের হৃদয়ে তো অন্য ভাষা। কেউ যদি এসএসসি পরীক্ষায় কেবল অংক আর উর্দু পাস করে, তাহলে তার হৃদয়ে বাংলা ভাষা থাকবে কী করে?’

‘আর যার হৃদয়ে বাংলাদেশের জন্য বাঙালির জন্য, বাংলা ভাষার জন্য কোনো দরদ না থাকে, ভালোবাসা না থাকে, তার হৃদয়ে থাকে পেয়ারে পাকিস্তান।’

‘বাংলা নববর্ষ এখন সবার’

এক সময় ধর্মীয় আবরণে বাধা আসলেও এখন নববর্ষ সব বাঙালিদের প্রাণের উৎসব হয়ে গেছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান সকলেই সমানভাবে এটা উদযাপন করে। যুগ যুগ ধরে এটা আমাদের দেশে পালিত হয়ে আসছে।’

‘এক সময় ছিল, পুরনো বছরের সমস্ত হিসাব নিকাশ সম্পূর্ণ করে চুকিয়ে দিয়ে নতুনভাবে আবার ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করা, হালখাতা খোলা এবং যাত্রা শুরু করা। এটাই ছিল আমাদের ঐতিহ্য।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উৎসবটা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে একাত্ম হয়ে উদযাপন করে। আর সে কারণেই আমরা গত বছের থেকে একটা ভাতার ব্যবস্থাও করে দিয়েছি। এখন বাংলাদেশে সব ধরনের মানুষ এই উৎসবটা উৎদযাপন করে। এমনকি প্রবাসে যারা তারাও উদযাপন করে।’

‘এমনকি আমাদের একেবারে গ্রাম পর্যায়েও যদি যান, সেখানেও উৎসবটা উদযাপন করছে। এখানে সবাই মন খুলে একাত্ম হয়ে উদযাপন করতে পারে। এই সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছে।’

জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ হবেই

নতুন বছর দেশের জন্য শুভ সূচনা এবং শুভ কামনা নিয়ে আসবে বলেও আশা করছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘এই দেশকে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে যেন আমরা গড়তে পারি সেই কামনাটাই আমরা করছি।’

‘আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের দেশ, বাংলা আমাদের ভাষা, এই কথাটা বলে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তারই আদর্শ নিয়েই বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলব। বাংলাদেশ হবে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ।’

‘উন্নয়নশীল দেশে আমরা উন্নীত হয়েছি। এখান থেকে আমরা এগিয়ে যাব, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে আমরা উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করব।’