অর্থ সংকটে আট বছরেও পূর্ণতা পায়নি খুলনার গল্লামারী স্মৃতিসৌধ

বি এম রাকিব হাসান, বিশেষ প্রতিনিধি, খুলনা : আট বছরেও পূর্ণতা পায়নি ‘খুলনার বধ্যভূমি গল্লামারী স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ’। মূলস্তম্ভ নির্মিত হলেও অর্থসংকটে বাকি কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে সৌধটির পবিত্রতা নষ্টসহ বিফলে যেতে বসেছে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অবশ্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলছেন, অর্থ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কোন সাড়া মিলছে না। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর খুলনায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহুল গল্লামারীতে স্বাধীনতা সৌধ নির্মাণের জন্য ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম বিপিএম (বার) পিপিএম ওই ভিত্তি প্রস্তরের উদ্বোধন করেন। খুলনা জেলা পরিষদের উদ্যোগে ওই সৌধটি নির্মাণে মোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১০ কোটি টাকা। যার মধ্যে থাকে মূলস্তম্ভ ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ, স্তম্ভের চারপাশে ১০ ফুট লাল টাইলস্ বসানো, পায়ে হাঁটা পথ, পার্কিং ইয়ার্ড, সীমানা প্রাচীর, গেট, সিকিউরিটি শেড, রেস্টুরেন্ট, দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান, পানির ফোয়ারা ইত্যাদি। এর মধ্যে মূল স্তম্ভ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
সূত্রটি জানায়, প্রকল্পটির অনুমোদনের পর মূল স্তম্ভ নির্মাণে ২ কোটি ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ওই অর্থ বরাদ্দের পর স্তম্ভ নির্মাণে দুই দফা দরপত্রের আহ্বান করে জেলা পরিষদ। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৩ জুন আহ্বানকৃত দরপত্রের প্রেক্ষিতে কাজটি পায় খুলনার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আজাদ-ইলোরা জেভি। যার ওয়ার্ক অর্ডার হয় ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর এবং মূল স্তম্ভ নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে। ওই বছরের মার্চে স্মৃতিসৌধের স্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমন নির্মিত ওই মূল স্তম্ভ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি স্মৃতিসৌধটিকে পূর্ণতা দিতে মূল নকশা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন। তার পরামর্শ ও মূল নকশা অনুযায়ী স্মৃতিসৌধের পূর্ণতা দিতে ২০১১ সালের মার্চে স্থানীয় সরকার বিভাগে বাকী ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে পত্র প্রেরণ করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান জেলা পরিষদ। স্থানীয় সরকার বিভাগ বাকী অর্থ প্রদান না করে ওই বছরের এপ্রিল মাসে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অর্থ প্রদানে সুপারিশ ও নির্দেশনা দেয়। কিন্তু আজ অবধি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় ওই অর্থ বরাদ্দ প্রদান করেনি। একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অবহিত করলেও কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সৌধটির পূর্ণতা না পেয়ে বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শুধুমাত্র স্মৃতিসৌধের মূল স্তম্ভ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের বাকি কাজের কিছুই করা হয়নি। সৌধের উপরে কিছু শিশুরা খেলাধূলা করছে। আর চতুরপাশে উন্মুক্ত জায়গায় গরু-ছাগল অবাধে বিচারণ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ রাতের বেলায় সৌধটিকে ঘিরে মাদক সেবীদের আড্ডা বসে।
খুলনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ বলেন, ‘খুলনার বধ্যভূমি গল্লামারীর স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ’র নির্মাণে মন্ত্রণালয় ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। জেলা পরিষদ ওই অর্থের সাথে আরও ১৬ লাখ যোগ করে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা দিয়ে মূল স্তম্ভ নির্মাণ করেছে। নকশা অনুযায়ী বাকী কাজ সম্পন্ন করতে আরও ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন। বাকী অর্থ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে কিন্তু তাতে কোন সাড়া মেলেনি। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্মৃতিসৌধটির পূর্ণতা দিতে পারলে এটি হবে একটি দৃষ্টিনন্দন স্বাধীনতা সৌধ। মানুষ এখানে স্বাচ্ছন্দে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। আর কঠোর নিরাপত্তার কারণে ওই সৌধের পবিত্রতাও রক্ষা পাবে। পাশাপাশি সৃষ্টি হবে মনোমুগ্ধকর পর্যটন ক্ষেত্র। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্মিলনীসহ নানা কর্মসূচি পালন সুযোগ তৈরি হবে।
প্রঙ্গত, স্বাধীনতার পর ১৯৯৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক রিয়াজুল হক ও পুলিশ সুপার আওলাদ হোসেনের উদ্যোগে গল্লামারীর এ স্থানে অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। ১৯৯৫ সালের ২৬ মার্চ স্মৃতিসৌধের পরিকল্পনাকারী রিয়াজুল হক বিজয় মঞ্চের উদ্বোধন করেন।