অর্থনীতি সমিতির সম্মেলনে কাজী খলীকুজ্জমান

পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সভাপতি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেছেন, দেশে নীতির কোনো অভাব নেই। অনেক ক্ষেত্রে খুব ভালো আইনও আছে। কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না আত্মতুষ্টি আর গাফিলতির কারণে। প্রধানমন্ত্রী যে সব নির্দেশ দেন তার সবগুলোই ভালো। কিন্তু এগুলো যারা বাস্তবায়ন করবেন তারাই কাজ করেন না।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের ‘শিল্প সংক্রান্ত বিষয়াবলী’ শীর্ষক সেশনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ৮টি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশ বরেণ্য অর্থনীতি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা অংশ নেন। সকালে ৪টি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এগুলো বিষয়বস্তু ছিল ‘ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত’, ‘বিশেষ প্রায়োগিক ক্ষেত্রসমূহ’, ‘দারিদ্র্য ও অসমতার সমস্যাসমূহ’ এবং ‘মানব মূলধন সংক্রান্ত’।

‘বাংলাদেশের সংবিধান ও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণ: কিছু নৈতিক প্রশ্ন’ শীর্ষক নিবন্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন খান উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারকে দিন বদলের সনদ আখ্যা দিয়েছিল। টেকসই ভাবে দারিদ্র্য উচ্ছেদ, একমুখী শিক্ষা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, দুর্নীতি রোধ, দখল-জবরদখলের মতো বিষয়গুলো সুরাহা হয়নি। আমলাতন্ত্রের সমস্যা তো আছেই। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা অবশ্যই আমলাতন্ত্র। সরকার আমলাতন্ত্রকে দায়িত্বশীল করার পরিবর্তে দায়মুক্তি ও আরো ক্ষমতাবান করতেই বেশি আগ্রহী।

‘শিক্ষা ব্যবস্থায় করপোরেট সংস্কৃতি: টেকসই উন্নয়নে এ যেন এক অশনি সংকেত’ শীর্ষক প্রবন্ধে সিলেট ক্যাডেট কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ জসীম উদ্্দীন বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন করপোরেট সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষার সকল স্তরের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান করপোরেট আদলে পরিচালিত হচ্ছে, যা অনাকাঙ্খিত। আর কতিপয় মুনাফালোভী ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিকে লাভের পথ সুগম করে দিচ্ছে রাষ্ট্র কাঠামো।

আর্থিক খাতে ভরসার অভাব: ‘বিশেষ প্রায়োগিক ক্ষেত্রসমূহ’ সেশনে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, ব্যাংক থেকে যারা হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে তারা কী সিএসআর (সামাজিক দায় বদ্ধতা) পালন করছে। আমরা শুধু ব্যাংকের ওপর চাপ দেই। এখন সময় এসেছে যারা কোটি টাকা ঋণ নেয় তারা সিএসআর পালন করে কী না, সেটি দেখার। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণগ্রহীতারা যাতে সুবিধাজনক সুদে ঋণ পায় এবং তথ্যসংক্রান্ত বৈষম্যের শিকার না হন, সেটা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। অন্য সেশনে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু দেশের অর্থনীতিবিদদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে তারা সেই ভূমিকা পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কয়েকজন নেতার হাতে কুক্ষিগত হয়ে গেছে। যার ফলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া সরকারগুলো আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির কোনো তোয়াক্কা করছে না।

‘সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন’ শিরোনামের আরেক প্রবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের জোসেফ করবেল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক হায়দার আলী খান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে গণভোটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নারী, সংখ্যালঘুদের মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে এই গণভোট থাকতে পারে। ‘দূষণ অর্থনীতি ও নৈতিকতা’ নিয়ে আলাদা এক নিবন্ধে জহিরুল ইসলাম সিকদার উল্লেখ করেন, দেশে রাজনীতি, অর্থনীতির, সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতার কারণে পরিবেশ নিয়ে কম ভাবা হচ্ছে। সরকার এসব বিষয়ে কম মাথা ঘামাচ্ছে। মানুষকে শুধু সচেতন করে তুললেই হবে না, রাষ্ট্র রাষ্ট্রের প্রতিনিধি সংস্থা ও দপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে।