অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে দায়িত্বে ফিরতে পারবেন না সিনহা: আইনমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনসহ যে সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ফিরতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে এগুলো দুদকের আওতাধীন। প্রথমে এসব অভিযোগের অনুসন্ধান হবে। অনুসন্ধানে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা হবে। তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না সেটা রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার।

রবিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন আইনমন্ত্রী। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে বক্তব্য দিয়েছেন তার জবাব দিতে এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বিদেশে যেতে দেওয়া হলো কেন এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, অভিযোগ থাকলে সেটা মামলা–মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়াতে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আইন অনুযায়ী বিচারপতি সিনহা এখনও প্রধান বিচারপতি। প্রধান বিচারপতি পদটি একটি প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক পদ। ফলে তার বিরুদ্ধে তাড়াহুড়ো বা খামখেয়ালি করে কিছু করা সমীচীন হবে না।’

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মুখে থাকা প্রধান বিচারপতি সিনহার ছুটির খবর সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়ার পর তা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছিল।

অসুস্থতার কারণে প্রধান বিচারপতি দীর্ঘ ছুটিতে গেছেন বলে তার ছুটির আবেদন দেখিয়ে আইনমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হলেও শুক্রবার বিদেশ যাওয়ার আগে হেয়ার রোডের বাসভবনের সামনে বিচারপতি সিনহা সাংবাদিকদের বলেন, অসুস্থতা নয়, সরকারের আচরণে বিব্রত হয়ে তিনি ছুটি নিয়েছেন।

প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন, তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়নি। তিনি স্বেচ্ছায় অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন। ছুটি শেষে আবার ফিরে আসবেন।

সেদিনই সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করা একটি চিঠিতে সিনহা বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি, কিন্তু ইদানিং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত।’

প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্যের জবাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আজকের সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটিতে যাওয়া সম্পর্কিত দুটি চিঠি পড়ে শোনান আইনমন্ত্রী। পরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যখন প্রধান বিচারপতি তার সরকারি বাসভবন ত্যাগ করেন তখন কাউকে অ্যাড্রেস না করে একটি চিঠিতে জানিয়েছেন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। আমি তার বক্তব্যে হতভম্ব। রাষ্ট্রপতিকে লিখেছেন তিনি অসুস্থ, অথচ সাতদিন পরে বলছেন সুস্থ। আসলে যখন প্রথমে বললেন, তখনই ডাক্তারি পরীক্ষা করা দরকার ছিল, কিন্তু তা হয় নাই।’

প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে বিতর্কের কোনো ‘অবকাশ নেই’ জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি ছুটি নিয়ে ব্যক্তিগত সফরে বিদেশে গেছেন। রাষ্ট্রপতি তার অনুপস্থিতিতে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার দিয়েছেন। এ নিয়ে বিতর্কের কোনো ‘অবকাশ নেই’।

আনিসুল হক বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক মহল কোনো ইস্যু না পেয়ে খড়কুটো দিয়ে বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যারা এ নিয়ে বিতর্ক করছে, তাদের একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। সেটা হাসিল হয়নি বলেই তাদের এই মায়াকান্না।’

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান বিচারপতির একান্ত সচিবের লেখা চিঠির বরাত দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন- অসুস্থতা ও মানসিক অবসাদ দূর করতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা চার দেশ সফর করবেন।

অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে লিখিত চিঠিতে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো রেওয়াজ নেই। তিনি শুধুমাত্র রুটিন মাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সংবিধানের ৯৭ ধারা উল্লেখ করে আনিসুল হক বলেন, ‘আমাকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য আইনসংগত নয়।’ অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে পারবেন।