অপেক্ষা – মরিয়ম আজাদ

মরিয়ম আজাদ – আজ তার সাথে আবারও কথা হবে।
হয়তো কিছু দিনের মধ্য দেখাও হতে পারে।
সম্পর্কের মাঝে দুরত্ব কখনো বাধা আনতে পারেনা এই ধারনাটা সত্যি করতে আর বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না শ্রেয়ার,,,এই ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরলো।

মুহিনের সাথে সম্পর্কটা এই সোশ্যাল মিডিয়ায় মাধ্যমেই।কে জেনেছিলো দূর দেশে থাকা ছেলেটা একদিন সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে দাঁড়াবে,,,।

ভালোবাসা কখন কোন জানালা দিয়ে উকি দেয় তা হয়তো কারোই জানা নেই।

সব ঠিকঠাক।বিয়েতে মুহিন পরবে নীল পাঞ্জাবি,,
শ্রেয়াকে মুহিন বলছিলো,,
যদি বিয়েতে কালো পরার নিয়ম থাকতো তাহলে ও শ্রেয়াকে কালো রঙের জামা পরাতো।শ্রেয়া ভুলিনি সে কথা,,কালো জামা বানিয়ে রেখেছে প্রথম যেদিন দেখা হবে সেদিন পরার জন্য।

হানিমুনে ইন্দোনেশিয়া বালিতে যাবে বলে ঠিক করে রেখেছে শ্রেয়া আর মুহিন।শ্রেয়া সাতার যানেনা তাই নিয়ে তার কতো দুশ্চিন্তা কিন্তু মুহিন সে তো নাছোড়বান্দা,, বলে রেখেছে দরকার হলে শ্রেয়াকে কোলে করে পানিতে নামাবে।এই নিয়ে দুজনের কতোবার খুনসুটি ঝগড়া ও হয়েছে।তাতে কি ভালোবাসা কমেনি তিল পরিমানও।
দুজনের জুটিটাই অন্যরকম একজন একগুঁয়ে আর অন্যজন বদমেজাজি।

মুহিন প্রায় সময়ই বলে “আমার বউটাকে শান্ত করার জন্য বেশি কিছুর দরকার হয় না,শুধু একটু মিষ্টি কথা বললেই রাগ কমে যায়” মুহিনের এসব কথায় শ্রেয়ার গাল লজ্জায় লাল হয়ে যায়।

এভাবেই কাটতে থাকে দিন গুলো।কিন্তু আস্তে আস্তে মুহিন বদলাতে থাকে শ্রেয়া বুঝতে পারছে মুহিন কিছু লুকাচ্ছে।কোনো ভাবেই তার মুখ থেকে কথা বের করতে পারেনি শ্রেয়া,,শুধু প্রতিবার একটাই উত্তর দিতো মুহিন ‘পারিবারিক ঝামেলা’।

দিন দিন সম্পর্কটা তিক্ততার পর্যায়ে চলে এলো।শ্রেয়ার বদমেজাজ মুহিনকে আরো মানসিক চাপে ফেলে দিলো।একমাত্র ছেলে সে পরিবারের।তাই সিদ্ধান্ত নিলো শ্রেয়ার সাথে এই লুকোচুরি শেষ করবে।তবে এর ভবিষ্যৎ মুহিনের জানা ছিলো,জানা ছিলো সে শ্রেয়াকে হারিয়ে ফেলবে চিরতরে,আফসোস শুধু এইটুকু তাকে ধরে রাখার অধিকার আর মুহিনের থাকবেনা।আবার তাকে চলে দিতেও ইচ্ছে করে না।সে যেনো নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে।

কিছুদিন যোগাযোগ বন্ধ রেখে আবারও শ্রেয়ার সাথে যোগাযোগ করলো প্রথমে সারারাত ওর বকাঝকা শুনে ওকে ঠান্ডা করলো তার পর ওকে বুঝাবার চেষ্টা করলো।শ্রেয়ার সব আবেগের আবদার গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো।

মেয়েটার আবদার গুলোও ছিলো অদ্ভুত।

তার প্রথম আবদার-মুহিন যেনো যত কিছুই হোক না কেনো সে যেনো তার সাথে একবারের জন্য হলেও দেখা করে।

দ্বিতীয় আবদার-বিদেশ থেকে তার জন্য কিছু আনতে হবে,,তা হলো ৭ টা চিঠি।যা সে সারাজীবন নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিবে।

তার তৃতীয় আবদার-মুহিন সিগারেট ছেড়ে দিবে।

মেয়েটার এসব আবদার শুনে মুহিনের মধ্য আরও অপরাধ বোধ কাজ করছিলো।ইচ্ছে হচ্ছিলো সব কিছু ফেলে শুধু শ্রেয়াকে নিয়ে বাচতে।ওকে ওর প্রাপ্য ভালোবাসা টুকু দিতে।মেয়েটা এমন কেনো! 
যতই ওর কাছ থেকে দূরে যাবার কথা ভাবে ততই আরও কাছে আসতে বাধ্য করে ও।

অন্যদিকে শ্রেয়া অনুভব করছিলো মুহিন হয়তো আর তার হবে না।এই ভয়টা তার সবসময়ই হতো,কারন মুহিনের পারিপার্শ্বিকতা থেকে শ্রেয়া ছিলো অনেক বেশি অনুপযোগী।

ব্যাপারটা মুহিন কখনো গায়ে না লাগালেও শ্রেয়া কখনো ভুলেনি।সবটুকু জেনেও মুহিনের ভালোবাসায় সাড়া দিয়েছিলো শ্রেয়া।সে জানতো ভুলটা কারোনা কিন্তু প্রকৃতির হিসাবের কাছে কারো থেকে কারো ভুল কমও ছিলো না।

তাই প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিয়েছিলো,খুব জঘন্য ভাবেই নিয়েছে।এই ঘা হয়তো দুজনেই কখনো মেটাতে পারবেনা।

সময়,স্থান,কাল সবই পরিবর্তন হয়েছে।মুহিনের বিয়ের পর যতবার সে শ্রেয়াকে দূরে সরাবার চেষ্টা করেছে ততবার তাকে দেখেছে কি করে মানুষ নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়।
তাকে ঘৃনা করার অনেক কারন ইচ্ছে করেই সে দিয়েছে শ্রেয়াকে,,আর তাই হয়েছে শ্রেয়াও অন্যর হাত ধরেছে মুহিনকে ভুলার আশায়। তবে বেলা শেষে দুজনের রাগের অগ্নিশিখায় দুজনেই দগ্ধ হয়েছে।

না তবুও শ্রেয়া তাকে ফিরে আসতে বলেনি,শেষ বার শুধু জানতে চেয়েছিলো সে ভালো আছে কিনা?
মুহিনও কখনো ফিরতে পারেনি আর সত্যি জবাবটাও দিতে পারেনি।
শুধু বলেছিলো ভালো থেকো, নিজের জন্য না হলেও যারা তোমায় ভালো বাসে তাদের জন্য।

সরাসরি কখনো দেখাও করে নি ওরা।

কিন্তু এখনো যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন অন্যজনের উপস্থিতি টের পায়,কি যেনো একটা অস্বস্তি তাদের বুকের মধ্য কাজ করে।
তারপর একটা বিশাল দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তারা নিজেদের জীবনের ব্যাস্ততায় নিজেকে ডোবানোর চেষ্টায় লেগে যায়।

এই দীর্ঘশ্বাস হয়তো এই জীবন থেকে ওই জীবন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে হবে তাদের।মাঝখানে শুধু থাকবে অপেক্ষা।

লেখিকা- অরন্য স্পন্দন