অকারণে সিজার করলে ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি সরকারের

নিজস্ব সংবাদদাতা : সন্তান জন্মের সময় প্রয়োজন ছাড়া কেবল টাকা আদায়ের জন্য সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবণতার মধ্যেই এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি এলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান অপারেশন করা হচ্ছে বলে সরকারি প্রতিবেদনে তথ্য আসার মধ্যেই এই সতর্কতা এলো।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, সিজারিয়ান অপারেশন করতে হলে যুক্তিসঙ্গত কারণ লাগবে। অপ্রয়োজনে এই অপারেশন করলে ব্যবস্থা নেবেন তারা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন স্বাস্থ্য প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে ঝুঁকি থাকলে পেট কেটে সন্তান বের করে আনা হয়। একে বলে সিজারিয়ান অপারেশন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে কোনো রকমের ঝুঁকি ছাড়াই এই অপারেশন করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালে সরকারি এক জরিপে দেখা গেছে দেশে স্বাভাবিক প্রসব ৬২ দশমিক ১ শতাংশ আর সিজারিয়ান ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অন্যান্যভাবে ২ দশমিক ৫ শতাংশ সন্তানের জন্ম হয়।

ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে বা বিডিএইচএস-এর তথ্য অনুসারে, ‘২০০৪ সালে সিজারের মাধ্যমে সন্তান হতো ৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে তা বেড়ে হয় ৯ শতাংশে। ২০১১ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে৷ আর ছয় বছরে এই সংখ্যাটি বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

মোট সন্তানের মধ্যে ৩৫ শতাংশ সিরাজিয়ান অপারেশনে জন্ম-এই হিসাবে ঘরে সন্তান প্রসব করা শিশুদেরকেও ধরা হয়েছে। আর বিডিএইচএস-এর তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ১০টির মধ্যে ছয়টি শিশুরই জন্ম হচ্ছে সিজারিয়ান পদ্ধতিতে৷ বেসরকারি হাসপাতলে এই সংখ্যা আরও বেশি, ৮০ শতাংশ৷

২০১৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্য বার্তায় বলা হয়েছে, যেসব বাচ্চার জন্ম সিজারিয়ানে হয়েছে, তাদের ৮০ শতাংশরই স্বাভাবিক প্রসব করানো যেত। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্মদান প্রায় আট গুণ বেড়েছে৷

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, একটি দেশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হার ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত৷

বেসরকারি হাসপাতালগুলো বাচ্চা প্রসবের ক্ষেত্রে প্যাকেজের ব্যবস্থাও করেছে। প্রসূতি বা তার স্বজনদেরকে জিজ্ঞেস করা হয় তারা কোনটা চান। অথচ সিরাজিয়ান অপারেশন লাগবে কি না, এটি প্রসূতি বা তার স্বজনদের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় না।
সিজারিয়ান অপারেশন করলে স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় বেশি টাকা পাওয়া যায় বলে চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ কোনো বিচার বিবেচনা ছাড়াই সিজারিয়ান অপারেশনের দিকে ঝুঁকছেন। এতে সন্তান প্রসবের সময়ও লাগে কম।

কিন্তু অপারেশনের পর মায়ের শরীরে প্রভাব পড়ে দীর্ঘমেয়াদী। আর সন্তানের ওপরও সিরাজিয়ান অপারেশনের প্রভাব থাকে। নানা গবেষণায় দেখা গেছে, সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে এমন শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনকি বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক জন্ম হয়েছে এমন শিশুর তুলনায় কম থাকে।

আবার সম্প্রতি একটি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশন করতে গিয়ে বাচ্চার মাথা কেটে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত ঠেকেছে।

চিকিৎসকরা স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানের চেয়ে সিজারিয়ান অপারেশনের দিকে ঝোঁকার বিষয়ে সমাজে প্রচলিত যে ধারণা আছে, সেটি যে সত্য তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্যেও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সিজারিয়ানের হার অনেক বেড়ে গেছে বলে একটা অভিযোগ আছে। এটা আমরা স্বীকারও করি।’

‘কিন্তু সিজারিয়ান করার প্রয়োজন যেখানে হবে না সেখানে যেন সিজার না করা হয় সেজন্য আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

এই ব্যবস্থাটা কী, তা বর্ণনা করে স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটা ফরম দেয়া হচ্ছে। যেখানে সিজার অপারেশন করা হয় সেখানে এ ফরম পূরণ করে আমাদেরকে জানাতে হবে।’

‘তারা যে তথ্য দিচ্ছে এগুলো সঠিক কি না তা আমরা যাছাই করবো। যারা প্রয়োজন না হওয়া সত্ত্বেও সিজার অপারেরেশন করবে তাদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার আমরা সেই ব্যবস্থাই নেব।’

Inline
Inline